চাকরির পেছনে না ছুটে কৃষিকে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্তই রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার খালেকুজ্জামান প্রামাণিককে সফল উদ্যোক্তায় পরিণত করেছে। বিদেশি ও দেশি জাতের আম চাষের পাশাপাশি মাছ, গাভি ও ছাগলের খামার গড়ে তুলে তিনি এখন মাসে গড়ে প্রায় দেড় লাখ টাকা আয় করছেন। তাঁর উদ্যোগে কর্মসংস্থান হয়েছে ১২ জনের এবং অনুপ্রাণিত হয়ে এলাকার অনেক তরুণও কৃষিভিত্তিক উদ্যোগে যুক্ত হয়েছেন।
রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার রামনাথপুর ইউনিয়নের প্রামাণিকপাড়া গ্রামে খালেকুজ্জামানের বিস্তৃত আমবাগান এখন স্থানীয়দের পাশাপাশি দূর-দূরান্তের দর্শনার্থীদেরও আকর্ষণ করছে। বাগানে রয়েছে লালচে আভাযুক্ত মিয়াজাকি, বেগুনি রঙের কিউজাই, ব্যানানা ম্যাঙ্গো, আম্রপালি, গৌড়মতি, হাড়িভাঙ্গা, বারি আম-১৬, কাটিমন, কিংসহ ১১ জাতের দেশি-বিদেশি আম। ফলের ভারে নুয়ে পড়া গাছগুলো দেখতে প্রতিদিনই বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ আসছেন।
খালেকুজ্জামানের জন্ম ১৯৮৪ সালে। চার ভাই-বোনের মধ্যে তিনি একজন। তাঁর বাবা শামসুল হক ছিলেন সচ্ছল কৃষক। ২০০৭ সালে ডিগ্রি পাসের পর পরিবার ও স্বজনদের অনেকেই তাঁকে চাকরির চেষ্টা করতে বললেও তিনি নিজের উদ্যোগে কিছু করার স্বপ্ন দেখতেন। সেই চিন্তা থেকেই কৃষিকাজকে পেশা হিসেবে বেছে নেন।
২০১০ সালের জুনে মিঠাপুকুর উপজেলার পদাগঞ্জ গ্রামের কৃষক বাবলু মিয়ার আমবাগান পরিদর্শনে গিয়ে আধুনিক আম চাষের সম্ভাবনা সম্পর্কে আগ্রহী হন তিনি। বাবলু মিয়ার কাছ থেকেই আম চাষের বিভিন্ন কৌশল শিখে একই বছরের সেপ্টেম্বরে বাবার দেওয়া দেড় লাখ টাকা মূলধন হিসেবে নিয়ে দুই একর জমিতে দেশি ও বিদেশি জাতের আমের চারা রোপণ করেন।
তিন বছর পর বাগানে প্রথম ফলন আসে। প্রথম বছরেই আম বিক্রি করে তিনি ২ লাখ ২০ হাজার টাকা আয় করেন। সেই সফলতার ধারাবাহিকতায় লাভের অর্থ ও পারিবারিক সহায়তায় ধীরে ধীরে বাগানের পরিধি বাড়ান। বর্তমানে তাঁর আমবাগান ১০ একর জমিতে বিস্তৃত।
আম চাষের পাশাপাশি গত আট বছর ধরে ৭০ শতক জমিতে মাছ চাষ করছেন খালেকুজ্জামান। এছাড়া খামারে রয়েছে পাঁচটি উন্নত জাতের গাভি এবং ছাগল পালন কার্যক্রম। সব মিলিয়ে তিনি একটি সমন্বিত কৃষি খামার গড়ে তুলেছেন।
বর্তমানে খরচ বাদ দিয়ে তাঁর মাসিক গড় আয় প্রায় দেড় লাখ টাকা। এই আয়ে তিনি নতুন বাড়ি নির্মাণ করেছেন, তিন একর জমি কিনেছেন এবং পরিবারের আর্থিক অবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটিয়েছেন।
আম বিপণন কৌশল সম্পর্কে খালেকুজ্জামান বলেন, “আমের বাজার নিয়ে আগে থেকেই পরিকল্পনা করি। মে মাসে বাজারে আম বেশি থাকায় দাম কম থাকে। তাই আমি এমন জাতের আম চাষ করছি, যেগুলো জুলাই-আগস্টে পাকে। মৌসুমের শেষ দিকে সরবরাহ কম থাকায় তখন ভালো দাম পাওয়া যায়। কৃষকদেরও লাভ বেশি হয়।”
নিজের সফলতার অভিজ্ঞতা অন্যদের মধ্যেও ছড়িয়ে দিয়েছেন তিনি। তাঁর পরামর্শে আশপাশের অনেক কৃষক আমবাগান, মাছের খামার এবং গাভি-ছাগল পালনের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হয়েছেন।
বদরগঞ্জ উপজেলার মোস্তফাপুর গ্রামের মতিন সরদার জানান, খালেকুজ্জামানের উৎসাহে তিনি দুই একর জমিতে আমবাগান করেছেন। পাশাপাশি ৯টি গাভি ও পাঁচটি ছাগল নিয়ে খামার গড়ে তুলেছেন। বর্তমানে কৃষিই তাঁর পরিবারের প্রধান আয়ের উৎস।
একইভাবে প্রামাণিকপাড়া গ্রামের হোসেন আলী বলেন, পাঁচ বছর আগে খালেকুজ্জামানের খামার দেখে তিনি আমবাগান ও ছাগলের খামার শুরু করেন। বর্তমানে তাঁর খামারে ২৩টি ছাগল রয়েছে এবং দুই একর জমির আমবাগানে চার ধরনের বিদেশি আম চাষ হচ্ছে। বছরে খরচ বাদ দিয়ে তিনি ৩ লাখ ৩৮ হাজার টাকা আয় করছেন।
তারাগঞ্জ উপজেলার সয়ার গ্রামের রনি মিয়া বাগান পরিদর্শনে এসে বলেন, “আমাদেরও আমবাগান আছে। এখানে এসে মিয়াজাকি, গৌড়মতি ও ব্যানানা ম্যাঙ্গো জাতের আম দেখে ভালো লেগেছে। ভবিষ্যতে এসব জাতের চারা সংগ্রহ করে বাগান করার পরিকল্পনা রয়েছে।”
বদরগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সেলিনা আফরোজ বলেন, “চাকরির পেছনে না ছুটে বাগান করে খালেকুজ্জামান যে সাফল্য এনেছেন, তা অবিশ্বাস্য। তাঁর পথ অনুসরণ করে বদরগঞ্জ উপজেলার অনেকে এখন বাগান ও খামারের মালিক। যুবকদের জন্য খালেকুজ্জামানের এ কাজ অবশ্যই অনুকরণীয়।”
স্থানীয়দের মতে, খালেকুজ্জামানের সাফল্য শুধু তাঁর নিজের জীবনই বদলে দেয়নি, বরং এলাকায় কৃষিভিত্তিক উদ্যোক্তা তৈরির ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
