সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকা থেকে নিখোঁজ হওয়া মিরাজ শেখ (৩০) নামে এক জেলেকে ঘিরে ওঠা গুমের অভিযোগের অবিলম্বে তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। সংস্থাটির দাবি, মিরাজকে সর্বশেষ কোস্টগার্ডের হেফাজতে দেখা গিয়েছিল, যা সত্য হলে গত দুই বছরে বাংলাদেশে এটিই প্রথম গুমের ঘটনা হতে পারে।
রোববার লন্ডন সময় রাতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এইচআরডব্লিউ বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষকে হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী ঘটনাটির দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান জানায়। একই সঙ্গে গুম প্রতিরোধে প্রস্তাবিত সংস্কার থেকে সরে না গিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জবাবদিহি নিশ্চিত করারও তাগিদ দেয় সংস্থাটি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের আগে ক্ষমতাচ্যুত সরকারের আমলে গুমের ঘটনা ব্যাপকভাবে ঘটেছে। সেই প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের নভেম্বরে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ জারি করেছিল। ওই অধ্যাদেশে গুমের অভিযোগ স্বাধীনভাবে তদন্ত এবং আদালতের অনুমতি ছাড়াই আটককেন্দ্র পরিদর্শনের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। তবে নবনির্বাচিত বিএনপি সরকার অধ্যাদেশটির মেয়াদ শেষ হতে দেয় এবং এর পরিবর্তে নতুন আইনের প্রস্তাব আনে, যেখানে মানবাধিকার কমিশনকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তের ক্ষমতা দেওয়া হয়নি।
এইচআরডব্লিউর এশিয়া অঞ্চলের উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেন, “শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে হাজারো মানুষ গুমের শিকার হয়েছেন এবং সর্বশেষ এ ঘটনা দেখাচ্ছে যে যথাযথ সংস্কার ছাড়া এ ধরনের ঘটনা আবারও ঘটতে পারে।” তিনি আরও বলেন, “এটা স্পষ্ট যে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে এ ধরনের চর্চা গভীরভাবে গেঁথে গেছে। সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া নতুন সরকারের নাগরিকদের সুরক্ষা, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা উচিত।”
এইচআরডব্লিউর তথ্যমতে, ১০ এপ্রিল রাতে মোংলার সুন্দরবনসংলগ্ন জয়মনির ঘোল এলাকায় কোস্টগার্ড সদস্যদের মিরাজ শেখকে আটক করে একটি স্পিডবোটে তুলে নিয়ে যেতে দেখেছেন বলে একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী জানিয়েছেন।
পরদিন পরিবারের সদস্যরা দিগরাজে কোস্টগার্ড কার্যালয়ে গেলে প্রথমে তাঁদের জানানো হয়, মিরাজ একটি “অভিযানে” রয়েছেন এবং পরে আসতে বলা হয়। তবে বিকেলে গেলে কর্তৃপক্ষ জানায়, তিনি কখনোই সেখানে ছিলেন না।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, যে চায়ের দোকান এলাকা থেকে মিরাজকে তুলে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে, সেখানকার মালিক জানিয়েছেন যে ২১ এপ্রিল কোস্টগার্ড পরিচয়ে এক ব্যক্তি এসে মিরাজের ফেলে যাওয়া মোটরসাইকেল নিয়ে যান। পরে কোস্টগার্ডের সদস্যরা সেটি আবার ফেরত দিয়ে যান।
মিরাজ শেখের পরিবারের আইনজীবী মুজাহিদুল ইসলাম শাহিন এইচআরডব্লিউকে বলেন, “প্রত্যক্ষদর্শীরা গুম করার সময় ও পরিস্থিতি এবং কোস্টগার্ডের সদস্যরা কীভাবে তাঁকে তুলে নিয়ে গেছেন, তার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন।”
পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ দায়ের, সংবাদ সম্মেলন এবং বিভিন্ন সরকারি কর্মকর্তার কাছে চিঠি পাঠানো হলেও কোনো অগ্রগতি হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। পরে মিরাজের বাবা হাইকোর্টে আবেদন করলে আদালত ১২ জুলাই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে তাঁকে খুঁজে বের করে ১৫ দিনের মধ্যে আদালতে হাজির করার নির্দেশ দেন।
অন্যদিকে কোস্টগার্ডের পশ্চিমাঞ্চলের জনসংযোগ কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মাহবুব হোসেন বারবার মিরাজকে আটকের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। গণমাধ্যমকে তিনি জানিয়েছেন, এ বিষয়ে তাঁদের কাছে কোনো তথ্য নেই।
এইচআরডব্লিউ বলছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫’ এবং ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এর মাধ্যমে গুমের ঘটনার স্বাধীন তদন্ত ও প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে পাঠানোর সুযোগ ছিল।
তবে নতুন সরকার এসব অধ্যাদেশের মেয়াদ শেষ হতে দিয়ে এমন আইন প্রস্তাব করেছে, যেখানে গুমের তদন্তের দায়িত্ব পুলিশের কাছেই থাকবে। মানবাধিকার কমিশনের ভূমিকা সীমিত হয়ে কেবল সংশ্লিষ্ট বাহিনী বা সরকারের কাছ থেকে তদন্ত প্রতিবেদন চাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে। পাশাপাশি কমিশনের সদস্য নিয়োগ ও বিধি প্রণয়নে সরকারের প্রভাব বৃদ্ধির আশঙ্কাও প্রকাশ করেছে সংস্থাটি।
মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেন, “নতুন সরকারের উচিত তাদের প্রস্তাবিত আইন সংশোধন করে মানবাধিকার কমিশনের ওপর যেকোনো ধরনের হস্তক্ষেপ দূর করা এবং কমিশনকে গুমের ঘটনা তদন্তের কর্তৃত্ব ফিরিয়ে দেওয়া।” তিনি সতর্ক করে বলেন, “পুলিশকে দিয়ে গুমের ঘটনার তদন্ত করালে কোনো জবাবদিহি নিশ্চিত হবে না এবং এই চর্চা বন্ধ করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাও তৈরি হবে না।”
