দক্ষিণ কোরিয়ায় উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন নিয়ে ভর্তি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করলেও ভিসা না পেয়ে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন প্রায় ৩০০ বাংলাদেশী শিক্ষার্থী। অভিযোগ উঠেছে, দক্ষিণ কোরিয়ার শিনগিয়ংজু বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে টিউশন, ভর্তি ও আবাসন বাবদ অর্থ গ্রহণ করলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভিসা প্রক্রিয়ার জন্য প্রয়োজনীয় নথি ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেয়নি। ফলে শিক্ষার্থীরা ভিসার আবেদনই করতে পারেননি। একই সঙ্গে আটকে রয়েছে প্রায় ১৮ কোটি টাকার ফি।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্ধারিত নীতিমালা অনুযায়ী ভিসা না হলে বা ভর্তি সম্পন্ন না হলে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অর্থ ফেরত দেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তা করা হয়নি। বরং কয়েক মাস ধরে অর্থ ফেরতের আশ্বাস দেওয়া হলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি।
নাদের আহমেদ রিমনের মতো বহু শিক্ষার্থী দক্ষিণ কোরিয়ায় পড়াশোনার সুযোগ পেয়ে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রায় ৬ লাখ টাকা পরিশোধ করেছিলেন। তবে ভিসার জন্য প্রয়োজনীয় নথি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জমা না দেওয়ায় তাদের বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন থমকে গেছে। পাঁচ মাস পার হলেও ফেরত পাননি জমা দেওয়া অর্থ।
পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে যখন গত ১৬ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিস অব গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের এক নোটিসে জানানো হয়, দক্ষিণ কোরিয়ার আদালত ৩ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনাকারী ‘ওয়ানসক এডুকেশনাল ফাউন্ডেশন’-কে দেউলিয়া ঘোষণা করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট ড. জুন সু কিম এক বার্তায় বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে আদালত নিযুক্ত ট্রাস্টির তত্ত্বাবধানে আইনি পুনর্বাসনের চেষ্টা করছে। তবে শিক্ষার্থীদের আটকে থাকা অর্থ কীভাবে ফেরত দেওয়া হবে, সে বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়নি।
বণিক বার্তার হাতে আসা শিক্ষার্থীদের তালিকা অনুযায়ী, প্রত্যেককে টিউশন ফি, ভর্তি ফি ও আবাসন ব্যয়সহ ৭১ লাখ ৩০ হাজার কোরিয়ান ওন, বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৬ লাখ টাকা জমা দিতে হয়েছে। সব মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাবে জমা হয়েছে প্রায় ১৮ কোটি টাকা। এ অর্থের বড় অংশই এসেছে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের সঞ্চয়, ঋণ কিংবা সম্পদ বিক্রির মাধ্যমে।
গ্লোবাল বিজনেস ম্যানেজমেন্ট গ্র্যাজুয়েট কোর্সে ভর্তিচ্ছু নাদের আহমেদ রিমন জানান, ২০২৬ সালের স্প্রিং সেশনের জন্য তিনি ৭ জানুয়ারি অফার লেটার পান এবং ১৩ জানুয়ারি নির্ধারিত অর্থ বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাবে পাঠান। কিন্তু প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা না দেওয়ায় তিনি ভিসা পাননি। তার ভাষ্য, দীর্ঘদিন যোগাযোগের চেষ্টা করেও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কোনো সন্তোষজনক উত্তর পাওয়া যাচ্ছে না এবং এখন অর্থ ফেরত পাওয়াই সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন শিক্ষার্থী ফয়সাল পাটওয়ারী। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় ভিসা প্রক্রিয়ার জন্য কোনো নথি জমা দেয়নি। রিফান্ড নীতিমালা অনুযায়ী এক মাসের মধ্যে অর্থ ফেরত পাওয়ার কথা থাকলেও পাঁচ মাস পেরিয়ে গেলেও কোনো অর্থ ফেরত মেলেনি। ই-মেইলেরও জবাব দেওয়া হচ্ছে না।
অর্থ ফেরত না পাওয়ায় অনেক পরিবার এখন ঋণের চাপে রয়েছে। অনেক শিক্ষার্থী নতুন করে অন্য কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করার সামর্থ্যও হারিয়েছেন। এ পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্তরা দক্ষিণ কোরিয়ার রাষ্ট্রদূত এবং বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে স্মারকলিপি দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন এবং কূটনৈতিক হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
এদিকে, বিশ্ববিদ্যালয়টির বাংলাদেশি প্রতিনিধি হিসেবে পরিচিত উই কেয়ার এডুকেশন জানিয়েছে, তারা প্রায় ১২০ শিক্ষার্থীর আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছিল। প্রতিষ্ঠানটির স্টুডেন্ট কাউন্সেলর আসানুর রহমান বলেন, শতাধিক শিক্ষার্থী অফার লেটার পেলেও অধিকাংশের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ভিসার জন্য প্রয়োজনীয় নথি জমা দেয়নি। তিনি জানান, সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী ভিসা না হলে ৯০ দিনের মধ্যে অর্থ ফেরত দেওয়ার কথা থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনাকারী ফাউন্ডেশন দেউলিয়া ঘোষিত হওয়ার পর থেকে রিফান্ড প্রক্রিয়াও স্থবির হয়ে পড়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ায় উচ্চশিক্ষার জন্য বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে শিনগিয়ংজু বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে এ ঘটনা বিদেশে ভর্তি প্রক্রিয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক সক্ষমতা, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং শিক্ষার্থীদের অর্থের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
