তীব্র গরমে পুরুষদের তুলনায় অনেক নারী বেশি অস্বস্তি, ক্লান্তি, মাথা ঘোরা ও অতিরিক্ত গরম অনুভব করেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পেছনে প্রধান কারণ হলো হরমোনের স্বাভাবিক পরিবর্তন, শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের ভিন্ন প্রক্রিয়া এবং বয়স ও শারীরিক অবস্থার মতো বিভিন্ন জৈবিক ও সামাজিক বিষয়। গবেষণায় দেখা গেছে, তাপপ্রবাহ নারীদের হৃদ্যন্ত্র ও রক্তনালির ওপর তুলনামূলক বেশি চাপ সৃষ্টি করতে পারে, এমনকি তাপজনিত মৃত্যুঝুঁকিও কিছু ক্ষেত্রে পুরুষদের চেয়ে বেশি।
হরমোনের পরিবর্তন বড় কারণ
যুক্তরাজ্যের সরকারি স্বাস্থ্যসেবা সংস্থা (এনএইচএস)-এর জেনারেল প্র্যাকটিশনার ও নারীস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. নিঘত আরিফ জানান, নারীদের বেশি গরম লাগার পেছনে দুটি প্রধান কারণ রয়েছে। একটি হলো হরমোনের স্বাভাবিক ওঠানামা, অন্যটি তাপের প্রতি শরীরের ভিন্ন প্রতিক্রিয়া।
তিনি বলেন, গবেষণায় দেখা গেছে নারীদের ঘাম পুরুষদের তুলনায় কম হয় এবং তুলনামূলক বেশি তাপমাত্রায় ঘাম শুরু হয়। ফলে শরীরের অতিরিক্ত তাপ দ্রুত বের হতে পারে না।
এ ছাড়া নারীদের শরীরে চর্বির পরিমাণ তুলনামূলক বেশি থাকায় তা তাপ ধরে রাখতে সাহায্য করে। একই সঙ্গে মাসিক চক্র, পেরিমেনোপজ, মেনোপজ, গর্ভাবস্থা ও স্তন্যদানকালীন সময় ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরন হরমোনের পরিবর্তন শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে প্রভাব ফেলে।
বয়স ও সামাজিক বাস্তবতার প্রভাব
বিশেষজ্ঞদের মতে, কম আয়ের পরিবারে অনেক নারী পরিবারের সদস্যদের দেখভালে ব্যস্ত থাকায় নিজের স্বাস্থ্যের প্রতি পর্যাপ্ত যত্ন নিতে পারেন না। এতে তাপপ্রবাহের প্রভাব আরও বাড়তে পারে।
বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তাপের প্রতি সংবেদনশীলতাও বাড়ে। যেহেতু নারীরা গড়ে পুরুষদের তুলনায় বেশি দিন বেঁচে থাকেন, তাই বয়সজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকির প্রভাবও তাঁদের ক্ষেত্রে বেশি দেখা যেতে পারে। পাশাপাশি কিছু ওষুধ এবং তৃষ্ণা অনুভবের ক্ষমতা কমে যাওয়াও হিট স্ট্রেসের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
মাসিকের সময় কেন বাড়ে অস্বস্তি?
মাসিকের বিভিন্ন পর্যায়ে হরমোনের পরিবর্তনের কারণে শরীরের তাপমাত্রাও পরিবর্তিত হয়। মাসিক শুরুর আগে প্রোজেস্টেরনের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় শরীর সামান্য বেশি উষ্ণ হয়ে ওঠে। এতে গরম বেশি লাগা, ক্লান্তি ও অস্বস্তি বাড়তে পারে।
অন্যদিকে মাসিক শুরু হলে ইস্ট্রোজেনের মাত্রা কমে যাওয়ায় শরীর ঠান্ডা রাখতে হৃদ্যন্ত্রকে বেশি কাজ করতে হয়। এ সময় অনেক নারী ক্লান্তি, অবসাদ, মাথা ঘোরা, উদ্বেগ, অনিদ্রা এবং কখনো কখনো হট ফ্ল্যাশ বা অজ্ঞান হওয়ার মতো সমস্যার কথাও জানান।
ডা. নিঘত আরিফ বলেন, মাসিকের সময় রক্তক্ষরণের ফলে শরীর থেকে আয়রন কমে যায়। এতে অক্সিজেন পরিবহনে সমস্যা সৃষ্টি হয়ে হৃদ্যন্ত্র ও রক্তনালির ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে, যা প্রচণ্ড গরমে আরও প্রকট হয়ে উঠতে পারে।
মেনোপজে বাড়ে হট ফ্ল্যাশ
পেরিমেনোপজ ও মেনোপজের সময় ইস্ট্রোজেনের মাত্রা কমে যাওয়ায় অনেক নারীর হট ফ্ল্যাশ এবং রাতে অতিরিক্ত ঘাম হওয়ার সমস্যা দেখা দেয়। তাপপ্রবাহের সময় এসব উপসর্গ আরও তীব্র হতে পারে। যদিও হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি (এইচআরটি) কিছুটা উপকার দেয়, তবে এটি সব ক্ষেত্রে পুরোপুরি সমস্যা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না।
গর্ভাবস্থায় তাপপ্রবাহের বাড়তি ঝুঁকি
চলতি বছরের শুরুতে চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী ল্যানসেট-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, গর্ভাবস্থায় শরীরের বিপাকীয় কার্যক্রম বৃদ্ধি এবং পানির চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে হিট স্ট্রেসের ঝুঁকি বাড়ে।
গবেষণায় আরও বলা হয়, গর্ভাবস্থার শুরু ও মাঝামাঝি সময়ে প্রোজেস্টেরনের পরিবর্তনের কারণে শরীর বেশি গরম অনুভূত হতে পারে। শেষ পর্যায়ে ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরনের মাত্রা বৃদ্ধি পেলেও শরীরের অতিরিক্ত ওজন ও রক্তসঞ্চালনের চাপের কারণে তাপজনিত ঝুঁকি থেকেই যায়। এ পরিস্থিতি মা ও গর্ভের সন্তানের জন্যও ক্ষতিকর হতে পারে।
হিট এক্সজশন ও হিট স্ট্রোকের আশঙ্কা
গবেষণা অনুযায়ী, অতিরিক্ত গরমে হৃদ্রোগজনিত অসুস্থতা ও মৃত্যুঝুঁকি বেড়ে যায়, যা নারীদের ক্ষেত্রে তুলনামূলক বেশি হতে পারে।
তীব্র গরমে শরীর থেকে অতিরিক্ত পানি ও লবণ বের হয়ে গিয়ে হিট এক্সজশন দেখা দিতে পারে। এর সাধারণ লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে—
- অতিরিক্ত ঘাম
- ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া
- পেশিতে ব্যথা
- দুর্বলতা ও ক্লান্তি
- মাথা ঘোরা
- মাথাব্যথা
- বমি বমি ভাব
- অজ্ঞান হয়ে যাওয়া
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, এসব উপসর্গ গুরুতর আকার ধারণ করলে তা হিট স্ট্রোকে রূপ নিতে পারে, যা জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন হয়।
সূত্র: বিবিসি
