সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়, অনেকের জন্য এটি হয়ে উঠছে ক্যারিয়ার ও আয়ের নতুন ক্ষেত্র। যুক্তরাষ্ট্রের এরিন ম্যাকগফের ক্যারিয়ার তার একটি উদাহরণ। ‘ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক’-এ চাকরি করা এরিন করোনাকালে শখের বশে টিকটকে চাকরির সাক্ষাৎকার ও জীবনবৃত্তান্ত (সিভি) তৈরির পরামর্শ নিয়ে ভিডিও তৈরি শুরু করেন। অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁর অনুসারী বাড়তে থাকে লাখের ঘরে।
২০২০ সালে টিকটকে ভিডিও বানানো শুরু করার পর ২০২১ সালের মধ্যেই এরিনের অনুসারী সংখ্যা ২০ লাখে পৌঁছে যায়। পরে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে সরে গিয়েছিলেন। তবে অনুসারীদের কাছ থেকে পাওয়া বিভিন্ন বার্তা তাঁকে আবার ফিরিয়ে আনে। অনেকেই জানিয়েছিলেন, তাঁর পরামর্শ অনুসরণ করে তাঁরা কাঙ্ক্ষিত চাকরি পেয়েছেন কিংবা বেতন বাড়াতে পেরেছেন।
সিভি ও চাকরির বিষয়ে পরামর্শ দিতে দিতে এরিন নিজের জন্যও নতুন ক্যারিয়ার তৈরি করেন। ২০২৩ সালে তিনি ‘গ্রে ফিল্মস’ নামে একটি প্রযোজনা সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন। পরের বছর ইউটিউব সিরিজ ‘নো ওয়ান নোজ হোয়াট দে আর ডুইং’ শুরু করার পাশাপাশি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ‘পেঙ্গুইন র্যান্ডম হাউস’-এর সঙ্গে বই প্রকাশের চুক্তি করেন।
২০২৫ সালে তিনি ফোর্বসের ‘৩০ আন্ডার ৩০’ তালিকায় জায়গা পান। বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জেন-জি ও মিলেনিয়ালদের ক্যারিয়ার পরামর্শ দিয়ে তাঁর অনুসারী ৬৫ লাখের বেশি।
গুগল, মেটা, লিংকডইন, ইনডিড, হিলটন ও ক্যাপিটাল ওয়ানের মতো বৈশ্বিক ব্র্যান্ড তাঁর সঙ্গে কাজ করছে। এ কাজের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি তিনটি ‘সিলভার টেলি অ্যাওয়ার্ডস’, ‘ওয়েবি অনার’ ও ‘ক্লিও প্রাইজ’ পেয়েছেন। নিউইয়র্ক টাইমস, ওয়াশিংটন পোস্ট, সিএনবিসি ও ওয়াল স্ট্রিট জার্নালেও তিনি নিয়মিত লিখছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয়তা পেলেই দ্রুত বড় অঙ্কের আয় নিশ্চিত হয় না। এরিনের অভিজ্ঞতাতেও এর প্রমাণ রয়েছে। একটি কোর্সে তিনি জানিয়েছেন, টিকটক ক্রিয়েটর ফান্ডে যোগ দেওয়ার প্রথম চার সপ্তাহে তাঁর আয় হয়েছিল ২ হাজার ৫০০ ডলার। তখন তাঁর কোনো বড় ব্র্যান্ডের সঙ্গে চুক্তিও ছিল না।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক ব্যবসায় সাধারণত প্রথমে বিনামূল্যে কনটেন্ট তৈরি করে দর্শক তৈরি করতে হয়। পরে সেই দর্শক ও কনটেন্টের ভিত্তিতে আয়ের সুযোগ আসে।
২০২৬ সালের বাজার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ছোট নির্মাতাদের প্রতিও ব্র্যান্ডগুলোর আগ্রহ বাড়ছে। ১৫ হাজার থেকে ৫০ হাজার অনুসারী থাকা নির্মাতাদের সঙ্গে ব্র্যান্ডগুলো বেশি কাজ করছে। কারণ, বিপুলসংখ্যক অপ্রাসঙ্গিক দর্শকের তুলনায় তুলনামূলক কমসংখ্যক সক্রিয় ও প্রাসঙ্গিক দর্শক ব্র্যান্ডের জন্য বেশি মূল্যবান হতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে পেশা হিসেবে নেওয়ার ক্ষেত্রে আয়ের অনিশ্চয়তা বড় একটি বিষয়। ২০২৫ সালের একটি বৈশ্বিক গবেষণায় নির্মাতাদের আয়ের ক্ষেত্রে বড় ধরনের বৈষম্যের চিত্র উঠে এসেছে। অল্পসংখ্যক নির্মাতা বিপুল আয় করলেও অধিকাংশের আয় তুলনামূলক কম।
যুক্তরাজ্যে টিকটক ও ভিসা কনটেন্ট নির্মাতাদের জন্য বিশেষ ডেবিট কার্ড চালু করেছে বলে ২০২৬ সালের এপ্রিলে দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছিল। ভিসার গবেষণায় দেখা যায়, ৪৯ শতাংশ নির্মাতা কখনো না কখনো দেরিতে বা অনিয়মিত অর্থ পাওয়ার সমস্যায় পড়েছেন। অর্থের অনিশ্চয়তার কারণে ৪১ শতাংশ নির্মাতাকে কাজ ফিরিয়েও দিতে হয়েছে।
এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদমের ওপরও নির্মাতাদের অনেকটা নির্ভর করতে হয়। কোনো ভিডিও একদিন বিপুলসংখ্যক দর্শকের কাছে পৌঁছালেও পরদিন একই ধরনের ভিডিও খুব কম মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে।
বাংলাদেশেও টিকটক এখন শুধু নাচ-গানের কনটেন্টের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। রান্না, প্রযুক্তি, পড়াশোনা, বইয়ের পর্যালোচনা ও ছোট ব্যবসার প্রচারের মতো বিভিন্ন বিষয়ে কনটেন্ট তৈরি হচ্ছে।
তবে শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাফল্যের আশায় হঠাৎ চাকরি ছেড়ে দেওয়াকে নিরাপদ সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখানো হয়নি প্রতিবেদনে। বরং মূল চাকরি বা পড়াশোনা চালু রেখে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে অতিরিক্ত সুযোগ হিসেবে কাজে লাগানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
প্রথমে নিয়মিত কনটেন্ট তৈরি করে দক্ষতা ও নিজস্ব দর্শক তৈরি করা এবং আয়ের পথকে টেকসই করার পর চাকরি ছাড়ার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।
