প্রশাসন, সরকারি সংস্থা ও স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দলীয় বিবেচনায় নিয়োগের বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। দলীয় পরিচয়ের চেয়ে নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তির যোগ্যতাকে গুরুত্ব দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন আলোচনায় অংশ নেওয়া কয়েকজন। অন্যদিকে বিরোধী দলের নেতারা বলেছেন, দলীয়করণ অব্যাহত থাকলে গণ-অভ্যুত্থানের পর কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হবে।
শনিবার রাজধানীর রমনায় বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস) মিলনায়তনে ‘গণ-অভ্যুত্থানোত্তর বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি কোন পথে?’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় এসব মত উঠে আসে। অ্যালায়েন্স ফর মাল্টিডিসিপ্লিনারি রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস (এএমআরএ) এ আলোচনার আয়োজন করে।
আলোচনায় প্রশাসন ও স্থানীয় সরকারে দলীয়করণের বিরোধিতা করেন জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান মোমেন, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সংসদ সদস্য নুসরাত তাবাসসুম এবং জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরার সদস্য মো. আবদুল মান্নান।
নাজিবুর রহমান বলেন, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম বিষয় ছিল বৈষম্যহীন বাংলাদেশ। তাঁর মতে, দলীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হলে সেই চেতনার সঙ্গে বৈপরীত্য তৈরি হয়। দলীয়করণ ফিরে এলে ২০২৪ সালের আন্দোলনে তরুণদের আত্মত্যাগের অবমাননা হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, বিভিন্ন স্থানে হানাহানি ও দলীয়করণের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এখন থেকেই সতর্ক না হলে তৃণমূল পর্যায়ে সংঘাত থেকে বের হওয়া কঠিন হবে।
বিরোধী দলকে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির ১০ থেকে ১২টি সভাপতির পদ দেওয়ার প্রচলিত রীতির প্রসঙ্গও তোলেন নাজিবুর রহমান। তিনি বলেন, এসব পদ থেকে বিরোধী দলকে বাদ দেওয়ার বিষয়টি যদি জুলাই সনদ বাস্তবায়নের অংশ হয়, তাহলে তা নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার জন্য সহায়ক হবে না।
নুসরাত তাবাসসুম পুলিশ ও প্রশাসনে দলীয়করণ কমানোর আহ্বান জানান। তিনি বলেন, দেশে অনিরাপত্তা বাড়ছে এবং পুলিশ-প্রশাসন কোনো রাজনৈতিক দলের হয়ে কাজ করলে কোনো গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমেই কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন সম্ভব হবে না।
আবদুল মান্নানের অভিযোগ, প্রশাসকসহ বিভিন্ন পর্যায়ে দলীয় নিয়োগের ফলে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’-এর পরিবর্তে ‘সবার আগে বিএনপি’ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। তাঁর মতে, এই রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন প্রয়োজন।
দলীয় নিয়োগের প্রসঙ্গে দ্য ডেইলি স্টারের নির্বাহী সম্পাদক কামাল আহমেদ বলেন, রাজনৈতিক পরিচয় থাকা ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়া হলেও তাঁকে যোগ্য হতে হবে। তাঁর মতে, শুধু একটি দলকে নয়, সবাইকে নিয়ে বাংলাদেশের স্বার্থকে সামনে রেখে চিন্তা করা প্রয়োজন।
রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনের জন্য আগে রাজনৈতিক দলের ভেতরের সংস্কৃতি বদলানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। একই সঙ্গে বিরোধী দলের সঙ্গে সরকারের যৌক্তিক সহযোগিতার সম্পর্ক থাকা প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন কামাল আহমেদ।
সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করা কামাল আহমেদ বর্তমান সরকারকে ওই কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের আহ্বান জানান।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নাহরিন আই খান বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশেও সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে বিভিন্ন সরকারি পদে পরিবর্তন আসে। তাঁর মতে, রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কেউ পেশাদারভাবে দায়িত্ব পালন করলে সেই নিয়োগে সমস্যা থাকার কথা নয়।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রেস সচিব আবু আবদুল্লাহ এম ছালেহ বলেন, রাজনৈতিক পরিচয় থাকা অপরাধ নয়; বরং ওই ব্যক্তির আচরণ দলীয় কি না, সেটি বিবেচ্য। যোগ্যতার প্রশ্নে তিনি বলেন, কে যোগ্য বা অযোগ্য তা নির্ধারণের জন্য তদন্তের প্রয়োজন হতে পারে। তাঁর দাবি, জনগণ যে গুণগত পরিবর্তন চায়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তা শুরু করেছেন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রেজওয়ানা করিম স্নিগ্ধা রাজনৈতিক বক্তব্যনির্ভর রাজনীতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাঁর মতে, সরকার ও বিরোধী—দুই পক্ষকেই সমস্যা সমাধানে গুরুত্ব দিতে হবে। জনতুষ্টিমূলক রাজনীতি বিরোধী অবস্থানে থাকা দলের জন্য একভাবে কাজ করলেও সরকারে থেকে তা করতে গেলে জটিলতা তৈরি হতে পারে।
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক জামায়াতের নেতাদের উদ্দেশে প্রশ্ন তোলেন, সরকারকে ব্যর্থ করে দিলে পরবর্তী পরিস্থিতি কী হবে। তিনি রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে কোনো পক্ষ যেন আত্মঘাতী অবস্থানে না যায়, সে বিষয়ে সতর্ক করেন।
সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন (পুতুল) বলেন, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় নয়, দায়িত্বে রয়েছে। সবার যৌক্তিক বিষয় ও আলোচনাকে বিবেচনায় নিয়ে সরকার কাজ করতে চায়।
আলোচনার শুরুতে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেন, সরকার ও বিরোধী দল যেন দেশের স্বার্থে পরস্পরকে সহযোগিতা করে—এমন সংসদ ও রাষ্ট্রকাঠামো প্রয়োজন। সরকারের ভুল থাকলে যৌক্তিক সমালোচনা করার সুযোগও থাকা উচিত।
তাঁর মতে, অপপ্রচার, মিথ্যাচার ও চরিত্রহনন গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। একটি রাজনৈতিক দলের পক্ষে এককভাবে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি তৈরি করা সম্ভব নয়; গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী সব রাজনৈতিক দলকে এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে হবে।
এএমআরএর আহ্বায়ক অধ্যাপক বুলবুল সিদ্দিকীর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত আলোচনায় নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ওয়ারেসুল করিম, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক আবদুল কাদের, এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন ও যুগ্ম সদস্যসচিব ফরিদুল হক, এনপিএর মুখপাত্র ফেরদৌস আরা রুমী ও নাজিফা জান্নাত, এবি পার্টির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নাসরিন সুলতানা (মিলি), সাংবাদিক শাহেদ আলম ও এহসান মাহমুদ এবং সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হাবিবুর রহমানসহ অন্যরা বক্তব্য দেন। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব শাহাদাৎ হোসেন (স্বাধীন) উপস্থিত ছিলেন।
