সরকার গঠনের ছয় মাসের মাথায় প্রথমবারের মতো মন্ত্রিসভায় রদবদল হয়েছে। শুক্রবার রাষ্ট্রপতি হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের শপথের পর তিনজন নতুন পূর্ণ মন্ত্রী ও দুজন প্রতিমন্ত্রী শপথ নেন। একই সময়ে একজন প্রতিমন্ত্রীকে পূর্ণ মন্ত্রী করা হয়েছে, একজন মন্ত্রীর দায়িত্ব পরিবর্তন এবং আরেকজনকে মন্ত্রিসভা থেকে সরিয়ে মন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা করা হয়েছে।
সর্বশেষ পরিবর্তনের পর প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রিসভার সদস্যসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫১ জনে। এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রী ছাড়া পূর্ণ মন্ত্রী ২৬ জন এবং প্রতিমন্ত্রী ২৪ জন। মন্ত্রিসভার বাইরে প্রধানমন্ত্রীর ১১ জন উপদেষ্টা রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ছয়জন মন্ত্রীর এবং পাঁচজন প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় দায়িত্ব পালন করছেন।
মন্ত্রিসভার এই পরিবর্তনকে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলের কেউ কেউ প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত ছয় মাসের কর্মমূল্যায়নের প্রাথমিক ফল হিসেবে দেখছেন। আবার অন্যদের মতে, শূন্য পদ পূরণ, দপ্তর পুনর্বণ্টন এবং রাজনৈতিক সমন্বয়ের অংশ হিসেবেই এই রদবদল করা হয়েছে।
এর মধ্যেই মন্ত্রিসভায় আবারও পরিবর্তনের আলোচনা শুরু হয়েছে। সরকারসংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কয়েক সপ্তাহের মধ্যে আরেক দফা পরিবর্তন হতে পারে। তবে এ পরিবর্তন সেপ্টেম্বর পর্যন্তও গড়াতে পারে বলে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে আলোচনা রয়েছে।
সর্বশেষ রদবদলের পর মন্ত্রিসভার কাঠামো নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কয়েকটি মন্ত্রণালয়ে একই সঙ্গে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রয়েছেন। তুলনামূলক ছোট কিছু মন্ত্রণালয়েও মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এখন একজন পূর্ণ মন্ত্রীর পাশাপাশি দুজন প্রতিমন্ত্রী রয়েছেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে আগে থেকেই প্রতিমন্ত্রী ছিলেন শামা ওবায়েদ ইসলাম। নতুন করে প্রতিমন্ত্রী হয়েছেন হুমায়ুন কবির। তবে তাঁদের দায়িত্বের সুনির্দিষ্ট বণ্টন এখনো জানানো হয়নি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, একটি মন্ত্রণালয়ে একাধিক প্রতিমন্ত্রী থাকা অস্বাভাবিক নয়। তাঁর মতে, সরকারের কাজের গতি বাড়াতে মন্ত্রীর সঙ্গে একাধিক প্রতিমন্ত্রী দায়িত্ব পালন করতে পারেন।
প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে একজন মন্ত্রী, একজন প্রতিমন্ত্রী এবং প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদার একজন উপদেষ্টা রয়েছেন। মন্ত্রী হিসেবে আছেন আরিফুল হক চৌধুরী এবং প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক। এই মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার দায়িত্বে রয়েছেন মাহদী আমিন।
এ ছাড়া এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের বৈদেশিক কর্মসংস্থান বিষয়ে সচিব পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মো. শাকিরুল ইসলাম খান।
পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আড়াই মাসের বেশি সময়ের শূন্যতা পূরণ করে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি সাচিং প্রু জেরীকে পূর্ণ মন্ত্রী করা হয়েছে। সেখানে আগে থেকেই প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন। তিনি একই সঙ্গে ভূমি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করছেন।
ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদ এবং নতুন প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ শামীম কায়সার দায়িত্ব পেয়েছেন। তাঁকে নিয়ে হেফাজতে ইসলামসহ সংশ্লিষ্ট ঘরানার আলেমদের পক্ষ থেকে আপত্তি জানিয়ে বিবৃতি দেওয়া হয়েছে।
তথ্য ও সম্প্রচার, সংস্কৃতি, পরিকল্পনা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়েও মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টা—তিন স্তরের নেতৃত্ব রয়েছে। স্বাস্থ্য ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর পাশাপাশি বিষয়ভিত্তিক বিশেষ সহকারীও রয়েছেন।
রদবদলে বিএনপির নির্বাচনী জোটসঙ্গী বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান আন্দালিভ রহমান পার্থকে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী করা হয়েছে। বিষয়টিকে কেউ কেউ রাজনৈতিক অংশীদারত্বের প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন। তবে এ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা জহির উদ্দিন স্বপনকে সরিয়ে দেওয়ার কারণ স্পষ্ট করা হয়নি।
অন্যদিকে সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌপরিবহন—এই তিনটি বড় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব একজন পূর্ণ মন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের হাতে রয়েছে। তাঁর সঙ্গে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে আছেন হাবিবুর রশিদ ও মো. রাজীব আহসান।
শিল্প, বাণিজ্য এবং বস্ত্র ও পাট—এই তিন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বও একজন পূর্ণ মন্ত্রীর হাতে। অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে রয়েছেন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও মন্ত্রী পদমর্যাদার উপদেষ্টা।
কৃষি ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মো. আমিনুর রশীদ। এর মধ্যে প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে আছেন সুলতান সালাউদ্দিন।
মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে দায়িত্ব বণ্টনের এই পার্থক্য নিয়ে বিএনপির ভেতরে-বাইরে এবং জনপরিসরে আলোচনা চলছে।
সরকারের প্রথম ছয় মাসের কর্মকাণ্ড মূল্যায়নের সঙ্গে এবারের রদবদলের সম্পর্ক রয়েছে বলে আলোচনা শুরু হয়েছে। সরকার গঠনের শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনার কথা জানিয়েছিলেন।
প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের উপদেষ্টা ও বিশেষ সহকারীদের নিয়ে গঠিত একটি কমিটি বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের প্রথম ১৮০ দিনের অর্জন, কর্মকাণ্ড ও সীমাবদ্ধতা পর্যালোচনা করছে।
তবে সর্বশেষ রদবদলকে ছয় মাসের কর্মমূল্যায়নের পূর্ণাঙ্গ ফল বলা যাচ্ছে না। কোন মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী কোন সূচকে কেমন করেছেন, মূল্যায়নের মানদণ্ড কী ছিল কিংবা কার দায়িত্ব কেন পরিবর্তন করা হয়েছে—সরকারের পক্ষ থেকে এসব বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।
সরকারের ভেতরে সাত-আটটি মন্ত্রণালয়ের কাজে প্রত্যাশিত গতি না থাকার আলোচনা থাকলেও এবারের রদবদলে তার প্রতিফলন সীমিত। এ কারণে সরকারসংশ্লিষ্ট একটি অংশ এটিকে ছয় মাসের মূল্যায়নের প্রথম ধাপ হিসেবে দেখছে।
অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, নির্দিষ্ট সময় পর মন্ত্রিসভার কার্যক্রম মূল্যায়ন করে প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন আনা হবে। ভবিষ্যতেও মন্ত্রিসভায় আরও রদবদল হতে পারে।
সরকার ও বিএনপির সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে মন্ত্রিসভায় আরও সম্প্রসারণ ও দপ্তর পুনর্বণ্টন হতে পারে। তখন কয়েকজন নতুন মন্ত্রী এবং বিশেষ করে প্রতিমন্ত্রী যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
কৃষি ও প্রাণিসম্পদ, বাণিজ্য ও শিল্প, বস্ত্র ও পাট, রেলপথ, সড়ক পরিবহন ও সেতু এবং নৌপরিবহনের মতো একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়ার বিষয়েও আলোচনা রয়েছে।
তবে এসব এখনো আলোচনার পর্যায়ে। নতুন করে কতজন যুক্ত হবেন বা সম্ভাব্য সদস্যদের তালিকা কী—সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের তথ্য পাওয়া যায়নি। চলমান কর্মমূল্যায়ন, সরকারের এক বছরের কর্মসূচি, দল ও সরকারের মধ্যে সমন্বয় এবং আঞ্চলিক প্রতিনিধিত্ব বিবেচনায় নিয়ে প্রধানমন্ত্রী সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের ভাষ্য, মন্ত্রিসভা পুনর্গঠন বা দপ্তর পুনর্বণ্টন প্রধানমন্ত্রীর এখতিয়ার এবং এটি সরকারের নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ।
সর্বশেষ পরিবর্তনের পর ৫১ সদস্যের মন্ত্রিসভা ১৯৯১ সালের পর রাজনৈতিক সরকারগুলোর কয়েকটি বড় মন্ত্রিসভার কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে।
২০০৯-১৪ মেয়াদে আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রিসভায় সদস্য ছিলেন ৬২ জন। ২০০১-০৬ মেয়াদে বিএনপি সরকারের মন্ত্রিসভায় ছিলেন ৬০ জন। আর আওয়ামী লীগ সরকারের ২০১৪-১৯ মেয়াদে মন্ত্রিসভার সদস্যসংখ্যা ছিল ৫৯।
সামনে নতুন সদস্য যুক্ত হলে বর্তমান মন্ত্রিসভাও এসব বড় মন্ত্রিসভার আরও কাছাকাছি চলে যাবে।
সব মিলিয়ে ছয় মাসের কর্মমূল্যায়নের সময়ে মন্ত্রিসভার আকার বৃদ্ধি, একই মন্ত্রণালয়ে একাধিক স্তরের রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং বড় ও ছোট মন্ত্রণালয়ের মধ্যে দায়িত্ব বণ্টনের পার্থক্য—এই তিনটি বিষয় নিয়ে সরকারের সামনে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। ফলে শুক্রবারের রদবদলকে চূড়ান্ত পুনর্গঠন না ধরে পরবর্তী পরিবর্তনের একটি ধাপ হিসেবেই দেখছেন সংশ্লিষ্টদের অনেকে।
