মৃত্যুর পর মানুষের জীবনের প্রথম ধাপ হিসেবে বিবেচিত আলমে বরজখে কবরের প্রশ্ন ও জবাব ইসলামী আকিদার গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। কোরআন ও হাদিসের আলোকে আলেমরা বলেন, আল্লাহ তাআলার বিশেষ অনুগ্রহে কিছু শ্রেণির মানুষ কবরের প্রশ্ন বা ফিতনা থেকে মুক্তি পেতে পারেন। এ বিষয়ে বিভিন্ন সহিহ হাদিসে তাদের মর্যাদা ও বিশেষ পুরস্কারের কথা উল্লেখ রয়েছে।
ইসলামী সূত্র অনুযায়ী, মৃত্যু কোনো সমাপ্তি নয়; বরং দুনিয়া ও আখিরাতের মধ্যবর্তী জীবনের সূচনা। কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, “প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। অতঃপর তোমাদেরকে আমাদের কাছেই ফিরিয়ে আনা হবে।” (সুরা আনকাবুত: ৫৭)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “কবর হয় জান্নাতের বাগানসমূহের একটি বাগান অথবা জাহান্নামের গর্তসমূহের একটি গর্ত।” (তিরমিজি, হাদিস: ২৪৬০)
১. সীমান্ত পাহারায় নিয়োজিত অবস্থায় মৃত্যুবরণকারী
রাষ্ট্রের নিরাপত্তায় সীমান্ত পাহারা দিতে গিয়ে মৃত্যুবরণকারীদের জন্য বিশেষ মর্যাদার কথা হাদিসে এসেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, সীমান্ত পাহারারত অবস্থায় মৃত্যুবরণকারী ব্যক্তি কিয়ামত পর্যন্ত তার আমলের সওয়াব পেতে থাকবেন এবং তিনি কবরের পরীক্ষার ফিতনা থেকে নিরাপদ থাকবেন। (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২৭৬৭)
২. শহিদ
ইসলামে শহিদের মর্যাদা অত্যন্ত উচ্চ। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, শহিদের জন্য তরবারির ঝলকই কবরের ফিতনা থেকে মুক্তির জন্য যথেষ্ট। (সুনানে নাসায়ি, হাদিস: ২০৫৩)
৩. পেটের রোগে মৃত্যুবরণকারী
দীর্ঘ সময় পেটের রোগে আক্রান্ত থেকে মৃত্যুবরণকারীদের সম্পর্কেও সুসংবাদ রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি পেটের রোগে মৃত্যুবরণ করবে, তাকে কবরে আজাব দেওয়া হবে না।” (জামে তিরমিজি, হাদিস: ১০৬৪)
অন্য এক হাদিসে মহামারি, ডুবে মৃত্যু, আগুনে পুড়ে মৃত্যু, ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়ে মৃত্যু এবং গর্ভাবস্থায় মৃত্যুবরণকারী নারীদেরও শহিদের মর্যাদার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৩১১১)
৪. নিয়মিত সুরা আল-মুলক তিলাওয়াতকারী
হাদিসে সুরা আল-মুলককে কবরের শাস্তি থেকে রক্ষাকারী সূরা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ৩০ আয়াতবিশিষ্ট একটি সূরা তার পাঠকারীর জন্য সুপারিশ করতে থাকবে, যতক্ষণ না তাকে ক্ষমা করা হয়। (জামে তিরমিজি, হাদিস: ২৮৯১)
এ কারণে প্রতিদিন, বিশেষ করে রাতে ঘুমানোর আগে সুরা আল-মুলক তিলাওয়াতের প্রতি উৎসাহিত করা হয়েছে।
৫. জুমার দিন বা রাতে মৃত্যুবরণকারী
জুমার দিনকে ইসলামে বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ দিন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। হাদিসে এসেছে, “যে মুসলমান জুমার দিন অথবা জুমার রাতে মৃত্যুবরণ করবে, আল্লাহ তাকে কবরের ফিতনা থেকে নিরাপদ রাখবেন।” (জামে তিরমিজি, হাদিস: ১০৭৪)
আলেমদের বিভিন্ন আলোচনা ও বর্ণনায় নবী-রাসুল, সিদ্দীক, নাবালেগ শিশু এবং শরিয়তের দায়িত্বমুক্ত ব্যক্তিদের কবরের প্রশ্ন বা শাস্তি থেকে অব্যাহতির বিষয়ও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব বর্ণনার গ্রহণযোগ্যতার মান এক নয়। এ কারণে এ বিষয়ে সহিহ বর্ণনাকেই অগ্রাধিকার দেওয়ার পরামর্শ দেন গবেষকরা।
ইসলামী শিক্ষায় কবরের সফলতার জন্য শুধু একটি নির্দিষ্ট আমলের ওপর নির্ভর না করে বিশুদ্ধ আকিদা, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত ও আমল, নিয়মিত তওবা-ইস্তিগফার, মানুষের হক আদায় এবং নেক কাজে অবিচল থাকার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ধর্মীয় বিশ্লেষকদের মতে, কবরের জীবন আখিরাতের প্রথম ধাপ। সেখানে সফলতা পরবর্তী ধাপগুলোকে সহজ করে দেয়। তাই একজন মুমিনের প্রস্তুতি হওয়া উচিত ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার জীবনের পাশাপাশি আখিরাতের স্থায়ী জীবনের জন্যও।
