সহিংস বিক্ষোভ ও নিরাপত্তাহীনতার মুখে কয়েক মাসে দেশ ছেড়েছেন অন্তত ১ লাখ ৬০ হাজার মানুষ
দক্ষিণ আফ্রিকায় অবৈধ অভিবাসনবিরোধী সহিংস বিক্ষোভ, হামলা ও লুটপাটের ঘটনায় নিরাপত্তাহীনতা চরমে পৌঁছেছে। প্রাণনাশের আশঙ্কায় মোজাম্বিক, নাইজেরিয়া, জিম্বাবুয়ে ও মালাউইসহ বিভিন্ন দেশের অন্তত ১ লাখ ৬০ হাজার অভিবাসী গত কয়েক মাসে দেশটি ছেড়ে নিজ দেশে ফিরে গেছেন। এমন পরিস্থিতির কথা জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান।
দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গের দক্ষিণাঞ্চলীয় থেম্বেলিহল এলাকায় বসবাসরত মালাউই নাগরিকরা সাম্প্রতিক সময়ে ধারাবাহিক সশস্ত্র হামলার শিকার হয়েছেন। গত ২৯ জুন ৬০ বছর বয়সী মালাউই নাগরিক ইব্রাহিম হুসেইনের বাড়িতে হামলা চালিয়ে তাকে মারধর করা হয় এবং মূল্যবান মালামাল লুট করে নেওয়া হয়। পরে ১৬ জুলাই রাতে একই এলাকায় অন্তত চারটি মালাউই পরিবারের বাড়িতে ডাকাতির পাশাপাশি তাদের দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার হুমকি দেওয়া হয়।
১৯৯৪ সালে নেলসন ম্যান্ডেলা ক্ষমতায় আসার পর আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে দক্ষিণ আফ্রিকায় অভিবাসনের প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। সরকারি আদমশুমারির তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৬ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে দেশটিতে বিদেশি নাগরিকের সংখ্যা বেড়ে ২৪ লাখে পৌঁছেছে, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩ দশমিক ৯ শতাংশ।
তবে দীর্ঘদিনের উচ্চ বেকারত্ব, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও সামাজিক সংকটের জন্য অভিবাসীদের দায়ী করার প্রবণতা বাড়তে থাকায় পরিস্থিতি ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। চলতি বছরের মার্চে শুরু হওয়া অভিবাসীবিরোধী আন্দোলন ৩০ জুন তীব্র আকার ধারণ করে। ওই সময় বিভিন্ন সংগঠন অবৈধ অভিবাসীদের দেশ ছাড়ার আল্টিমেটাম দেয়। এরপর থেকে বিভিন্ন এলাকায় হামলা, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং জোরপূর্বক উচ্ছেদের ঘটনা অব্যাহত রয়েছে।
হামলার শিকার মালাউই নাগরিক মুসা আদ্দি কুনজে জানান, অস্ত্রধারীরা তার বাসায় ঢুকে অর্থ না পেয়ে তাকে পিস্তল দিয়ে আঘাত করে এবং ফ্রিজ, টেলিভিশন ও মোবাইল ফোন নিয়ে যায়।
একই এলাকার বাসিন্দা আইশা মুহাম্মদ বলেন, নিজ দেশে ফেরার জন্য সঞ্চয় করা ৪ হাজার র্যান্ডও হামলাকারীরা লুট করে নিয়েছে। ফলে ইচ্ছা থাকলেও দেশে ফেরার খরচ জোগাড় করা তার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না।
গত সপ্তাহে জোহানেসবার্গে মালাউই কনস্যুলেটের বাইরে আশ্রয়ের অপেক্ষায় হাজারো মালাউই নাগরিক রাত কাটিয়েছেন। তাদের অনেকেই জানিয়েছেন, নিরাপত্তাহীনতা ও কর্মসংস্থান হারানোর কারণে দক্ষিণ আফ্রিকা ত্যাগ করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।
এদিকে আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থা মেডিসিনস সাঁ ফ্রঁতিয়ের (এমএসএফ) জানিয়েছে, অভিবাসীরা চিকিৎসাসেবা গ্রহণের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন ধরনের বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন।
তবে দক্ষিণ আফ্রিকার বিচারমন্ত্রী মামামোলোকো কুবায়ি মানবিক সংকটের অভিযোগ নাকচ করে বলেছেন, অবৈধ অভিবাসীদের ক্ষেত্রে সরকারের দায়িত্ব জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। অন্যদিকে মানবাধিকার সংগঠন সেকশন২৭ বলছে, দক্ষিণ আফ্রিকার আইন অনুযায়ী অভিবাসনের বৈধতা নির্বিশেষে প্রত্যেক মানুষের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার অধিকার রয়েছে।
এদিকে অভিবাসীবিরোধী সংগঠনগুলোর নেতারা আগামী কয়েক মাস আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। তবে সমালোচকদের অভিযোগ, দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটের দায় সরকারের পরিবর্তে অভিবাসীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল ও অস্থিতিশীল করে তুলছে।
