সরকার ১১টি সরকারি সংস্থা, বোর্ড ও করপোরেশনের শীর্ষ পদে এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিকভাবে বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের নিয়োগ দিয়েছে। একসঙ্গে এতসংখ্যক রাজনীতিবিদকে সরকারি প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে বসানোর ঘটনা এর আগে দেখা যায়নি। এ সিদ্ধান্তকে ঘিরে প্রশাসন ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মধ্যে যেমন আলোচনা তৈরি হয়েছে, তেমনি দলীয়করণ ও জবাবদিহি নিয়েও উঠেছে নানা প্রশ্ন।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের পৃথক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে গত বৃহস্পতিবার রাতে গ্রেড-২ পদমর্যাদায় এক বছরের জন্য এসব নিয়োগ দেওয়া হয়। সরকারি সূত্র বলছে, বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদেও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নিয়োগের বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।
নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে রয়েছেন বাংলাদেশ বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশনের চেয়ারম্যান হিসেবে বিএনপির বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক ও রাজশাহীর সাবেক মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল, বিআইডব্লিউটিসির চেয়ারম্যান হিসেবে দলের সহধর্মবিষয়ক সম্পাদক আবদুল বারী এবং বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে সহ-বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক কাজী রওনাকুল ইসলাম।
এ ছাড়া বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের চেয়ারম্যান হয়েছেন যুবদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সহসভাপতি জাকির হোসেন, বাংলাদেশ জুট করপোরেশনের চেয়ারম্যান হয়েছেন বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মামুন হাসান এবং বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক হয়েছেন জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের কার্যকরী সভাপতি সালাহ্উদ্দিন সরকার। পাশাপাশি বোয়েসেল, জাতীয় সমাজকল্যাণ পরিষদ, বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল করপোরেশন, বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশন এবং বিসিকের শীর্ষ পদেও বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
দলীয় ও প্রশাসনিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এ নিয়োগের পেছনে তিনটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় থেকে দলীয় মনোনয়ন না পাওয়া বা নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানো নেতাদের মূল্যায়ন করা। দ্বিতীয়ত, প্রশাসনের ভেতর থেকে সরকারের আস্থাভাজন ব্যক্তি না পাওয়া। তৃতীয়ত, দীর্ঘদিন আমলাদের মাধ্যমে পরিচালিত হলেও অনেক প্রতিষ্ঠানে প্রত্যাশিত ফল না আসা।
সরকারি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নিয়োগকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন না প্রশাসনের অনেক কর্মকর্তা। তাঁদের মতে, এতে দলীয়করণ, তদবির এবং জবাবদিহির সংকট তৈরি হতে পারে। সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকলেও রাজনৈতিকভাবে নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের জবাবদিহি কীভাবে নিশ্চিত হবে, সে প্রশ্নও তুলেছেন তাঁরা।
বিসিকের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পাওয়া বেনজীর আহমেদ বলেছেন, দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানটি কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি। সরকারের লক্ষ্য বিসিককে আরও কার্যকর করা এবং সেই উদ্দেশ্যেই তাঁকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের নবনিযুক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী রওনাকুল ইসলাম বলেন, “জলবায়ু নিয়ে কাজ করা সরকারি এ সংস্থার অবস্থা ভালো নয় বলে শুনেছি। এমনও শুনেছি, আমলারা এখানে কোনো কাজ করেনি। সংস্থায় অনেক দেনা করে রেখে গেছে। আমলারা অনেক সময় ঝুঁকি নিতে চান না। অনেক কিছুই করতে সাহসও পান না। জনগণের জন্য আমি কিছু করতে চাই। এই রুগ্ণ প্রতিষ্ঠানকে একটা পর্যায়ে নিয়ে যেতে চাই।”
সাবেক সচিব ও বাংলাদেশ লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের (বিপিএটিসি) সাবেক রেক্টর এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদারের মতে, আইনে এ ধরনের নিয়োগে বাধা না থাকলেও একসঙ্গে এতজন রাজনীতিবিদকে নিয়োগ দেওয়ার নজির আগে ছিল না। তিনি বলেন, “এ সিদ্ধান্ত একদিকে ভালো। এখন দেখা যাবে, আমলারা সরকারি প্রতিষ্ঠান ভালো চালান, নাকি রাজনীতিবিদেরা। সরকার মূল্যায়ন করতে পারবে।” একই সঙ্গে তিনি বলেন, ভবিষ্যতে দুর্নীতি কমানো, কাজের গতি বৃদ্ধি এবং সরকারি অর্থের সাশ্রয়ে নতুন নিয়োগপ্রাপ্তরা কতটা সফল হন, সেটিই হবে মূল্যায়নের বিষয়।
