দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য আবারও মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার উন্মুক্ত হতে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন বলেছেন, দুই দেশের নীতিগত সমঝোতার ভিত্তিতে আগামী আগস্টের শেষ সপ্তাহ থেকেই বাংলাদেশি শ্রমিকদের মালয়েশিয়ায় পাঠানোর কার্যক্রম শুরু করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) কুয়ালালামপুরে বাংলাদেশ হাইকমিশনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ তথ্য জানান। অনুষ্ঠানে শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী এবং মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার মঞ্জুরুল করিম খান চৌধুরীসহ হাইকমিশনের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
মাহ্দী আমিন বলেন, “দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের মাধ্যমে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার আবার উন্মুক্ত হয়েছে। দুই দেশের ঐকমত্যের ভিত্তিতে সব খাতের কর্মীদের জন্য কাজের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। আমরা একটি বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নির্ধারণ করেছি। আগামী আগস্টের শেষ সপ্তাহ থেকেই বাংলাদেশি শ্রমিকদের মালয়েশিয়ায় যাওয়া শুরু হবে।”
তিনি জানান, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা শ্রমবাজার পুনরায় চালু করতে মালয়েশিয়া সরকারের সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এ জন্য দেশটির প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম, মানবসম্পদমন্ত্রী দাতুক সেরি আর. রামানান এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি। তার ভাষায়, “সবার আগে বাংলাদেশ”—এই নীতিকে সামনে রেখে দেশের মানুষের স্বার্থ রক্ষায় সরকার কাজ করছে এবং শ্রমবাজার চালু হলে তা দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
মাহ্দী আমিন বলেন, প্রবাসী কর্মীদের কল্যাণ নিশ্চিত করতে সরকার অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ করছে। নতুন শ্রমবাজারে যেতে ইচ্ছুকদের ধৈর্য ধরে সরকারি নির্দেশনা ও নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণের আহ্বান জানান তিনি।
দালাল ও অসাধু চক্রের প্রতারণা ঠেকাতে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানান তিনি। বলেন, দেশে ফিরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হবে, যাতে কোনো কর্মী হয়রানির শিকার না হন।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জানান, খুব শিগগিরই দুই দেশের মধ্যে কারিগরি পর্যায়ের কার্যক্রম শুরু হবে। বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার হাইকমিশন, পাশাপাশি দুই দেশের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় যৌথভাবে পুরো প্রক্রিয়া পরিচালনা করবে। এর মাধ্যমে কর্মী নিয়োগ ব্যবস্থা আরও স্বচ্ছ ও গতিশীল করা হবে।
তিনি আরও বলেন, মালয়েশিয়া সরকার শিগগিরই নিয়োগসংক্রান্ত আনুষ্ঠানিক পদ্ধতি প্রকাশ করবে। একই সঙ্গে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ হাইকমিশনকে আরও জনবান্ধব প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মাহ্দী আমিন জানান, প্রথম ধাপের কর্মী নিয়োগে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বোয়েসেলকে অগ্রাধিকার দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য হলো অভিবাসন ব্যয় কমানো, দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং সম্পূর্ণ স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করা।
রিক্রুটিং এজেন্সির বিষয়ে তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় মালয়েশিয়ায় পাঠানো ৪২৩টি এজেন্সির তালিকা নিয়ে দেশটির সরকার নিজস্ব যাচাই-বাছাই করবে। তবে বাংলাদেশ সর্বোচ্চসংখ্যক যোগ্য এজেন্সিকে অন্তর্ভুক্ত করার অনুরোধ জানিয়েছে।
দুর্নীতি, অনিয়ম ও ফ্যাসিবাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের নতুন প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে না বলে স্পষ্ট জানান মাহ্দী আমিন। তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে অনিয়মে জড়িতদের লাইসেন্স বাতিল করেছে এবং মালয়েশিয়া সরকারকেও এ বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান জানানো হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে মাহ্দী আমিন বলেন, শ্রমবাজারের পাশাপাশি বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রযুক্তি ও সংস্কৃতি খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
তিনি জানান, মালয়েশিয়ার শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি দেশটির রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি প্রতিষ্ঠান পেট্রোনাসের মাধ্যমে বাংলাদেশের গ্যাস সংকট নিরসনের সম্ভাবনাও দুই দেশের আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে।
মাহ্দী আমিন বলেন, সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের বৈঠকে শ্রমবাজার, জ্বালানি সহযোগিতা এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদারের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, নতুন ও আধুনিক নিয়োগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দ্রুততম সময়ে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুরোপুরি কার্যকর হবে এবং এতে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হবে।
