বাংলাদেশে সাধারণত শীতকালীন অতিথি পাখি হিসেবে পরিচিত খয়রা কাস্তেচরা (Glossy Ibis) এখন রংপুর অঞ্চলে স্থায়ীভাবে আবাস গড়ে তুলছে। সাম্প্রতিক সময়ে রংপুর ও লালমনিরহাটে এ বিরল পাখির প্রজনন কলোনির সন্ধান মিলেছে, যা দেশের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
পাখিপ্রেমী ও গবেষকদের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, আগে শীত মৌসুমে বিল, নদীতীর ও জলাবদ্ধ কৃষিজমিতে বিচরণকারী এই পাখি এখন বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় নিয়মিত বাসা বাঁধছে এবং বংশবিস্তারও করছে।
২০২৩ সালে প্রথম জয়পুরহাটে দলবদ্ধভাবে খয়রা কাস্তেচরার প্রজনন কলোনির খবর পাওয়া যায়। পরের বছরও পাখিটির উপস্থিতি সম্পর্কে অনুসন্ধান চালানো হয়। পরে পাখির কলোনিবিষয়ক গবেষক শিবলি সাদিকের কাছ থেকে জানা যায়, জয়পুরহাটে আবারও খয়রা কাস্তেচরা আসতে শুরু করেছে।
এরপর রংপুর থেকে প্রকৌশলী ফজলুল হক, লেখক রানা মাসুদ ও অধ্যাপক তুহিন ওয়াদুদ জয়পুরহাটে গিয়ে পাখিটির কলোনি পরিদর্শন করেন। স্থানীয় পাখি আলোকচিত্রী আহনাফ আল সাদমানের সহায়তায় তারা শহরের উপকণ্ঠের একটি বাঁশঝাড়সংলগ্ন এলাকায় খয়রা কাস্তেচরার ঝাঁক এবং তাদের বাচ্চাও দেখতে পান।
২০২৫ সালে লালমনিরহাটে পাখিপ্রেমী রাসেল আহমেদের মাধ্যমে খয়রা কাস্তেচরার উপস্থিতির খবর পাওয়া যায়। সেখানে গিয়ে কয়েকটি পাখি দেখা গেলেও এবার আরও বড় পরিসরে তাদের অবস্থানের তথ্য মিলেছে।
চলতি বছরের এপ্রিলের শেষ দিকে রংপুরের মীরবাগ এলাকায় একসঙ্গে বহু খয়রা কাস্তেচরার উপস্থিতি লক্ষ্য করা হয়। পাখিগুলোর চলাচল অনুসরণ করে একটি বাঁশঝাড়ে পৌঁছে গবেষক ও পাখিপ্রেমীরা অসংখ্য বাসার সন্ধান পান। বাড়ির উঠান, ঘরের পাশ এবং গাছজুড়ে তৈরি হওয়া এসব বাসা থেকে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, এলাকাটি এখন খয়রা কাস্তেচরার একটি প্রজনন কলোনিতে পরিণত হয়েছে।
স্থানীয়দের কাছ থেকে জানা যায়, একসময় কিছু শিকারি ওই এলাকায় পাখি ধরতে এসেছিল। তবে স্থানীয় বাসিন্দারা তাদের বাধা দেন। পরে পাখিপ্রেমীরাও স্থানীয়দের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে যেকোনো শিকারের চেষ্টা সম্পর্কে দ্রুত জানাতে অনুরোধ করেন। পরবর্তী সময়ে আর কোনো শিকারের ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি।
পাখির কলোনিবিষয়ক গবেষক শিবলি সাদিক বলেন, “২০১১ সালে টাঙ্গুয়ার হাওরে প্রথমবারের মতো তিনটি খয়রা কাস্তেচরা দেখা গিয়েছিল। বাংলাদেশে এ পাখি ভালো খাবার পাচ্ছে এবং আগে যে দেশে থাকত, সেখানে কোনো না কোনো অসুবিধা থাকার কারণে বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় আসছে।”
খয়রা কাস্তেচরা দেখতে আকর্ষণীয় একটি জলচর পাখি। এর লম্বা ও বাঁকানো ধূসর চঞ্চু, মাথা ও ঘাড়জুড়ে গাঢ় খয়েরি রং এবং ডানায় সবুজাভ আভা রয়েছে। সূর্যের আলো পড়লে পালকে ধাতব উজ্জ্বলতা ফুটে ওঠে। এ বৈশিষ্ট্যের কারণেই এর ইংরেজি নাম Glossy Ibis। পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম Plegadis falcinellus।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে জলাভূমি, বনাঞ্চল ও ঝোপঝাড় দ্রুত কমে যাওয়ায় অনেক পাখির নিরাপদ আবাসস্থল সংকুচিত হচ্ছে। খয়রা কাস্তেচরার প্রজনন কলোনি এখনো অত্যন্ত বিরল হওয়ায় এসব এলাকা সংরক্ষণ জরুরি। স্থানীয় জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধি, শিকার প্রতিরোধ এবং আবাসস্থল রক্ষার মাধ্যমে এই বিরল অতিথি পাখির নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
