পদোন্নতি, বদলি, গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে পদায়ন, এমপিওভুক্তি, বকেয়া বেতন ছাড় এবং বিভিন্ন অনুদান পাওয়ার তদবিরে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) প্রাঙ্গণে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক শিক্ষকের সমাগম হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, এ সুযোগকে কেন্দ্র করে মাউশি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর ছত্রছায়ায় শতাধিক দালালের একটি সক্রিয় সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে, যারা বিভিন্ন পদ ও সেবার বিপরীতে মোটা অঙ্কের অর্থ লেনদেন করছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সচিবালয়ের ৬ নম্বর ভবনের ১৬ থেকে ১৮ তলায় অবস্থিত শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং আব্দুল গনি রোডের শিক্ষা ভবনে গত কয়েক মাস ধরে প্রতিদিনই সহস্রাধিক শিক্ষক বিভিন্ন ব্যক্তিগত ও প্রশাসনিক কাজ নিয়ে উপস্থিত হচ্ছেন। এতে প্রশাসনিক কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, “সব শিক্ষকই ঢাকায় বদলি হতে চান। বদলির অনুরোধ নিয়ে শিক্ষকরা এত বেশি আসেন যে মন্ত্রণালয়ে অফিস কক্ষেও সহজে প্রবেশ করতে পারি না।”
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারের কর্মকর্তাদের পদোন্নতি, বদলি এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে নিয়োগকে কেন্দ্র করে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, মাউশি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একাংশের কর্মকর্তা এবং দালালদের সমন্বয়ে পরিচালিত এই চক্র বিভিন্ন পদে নিয়োগ বা বদলির জন্য নির্ধারিত অঙ্কে অর্থ দাবি করে।
অভিযোগ অনুযায়ী, ঢাকার বিভিন্ন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পদে বদলির জন্য প্রতিষ্ঠানভেদে ৫ থেকে ১০ লাখ টাকা, জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা পদে ৫ থেকে ১০ লাখ, উপপরিচালক পদে ২০ থেকে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেনের কথা প্রচলিত রয়েছে।
এ ছাড়া কলেজ শিক্ষকদের ক্ষেত্রে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন কোনো দপ্তরের চেয়ারম্যান পদে দেড় থেকে দুই কোটি টাকা, মহাপরিচালক পর্যায়ের পদে দুই কোটি বা তার বেশি, পরিচালক পদে প্রায় এক কোটি টাকা, বড় সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ পদে ৩০ থেকে ৫০ লাখ এবং আঞ্চলিক পরিচালক পদে ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকা পর্যন্ত দাবি করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
সূত্রগুলোর দাবি, আগের সরকারের সময়ও এ ধরনের ঘুষের হার প্রচলিত ছিল। অনেক ক্ষেত্রে একই পদের জন্য একাধিক ব্যক্তির কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। ফলে কাজ না হওয়া এবং অর্থ ফেরত না পাওয়ায় একাধিক অভিযোগ শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় পর্যন্ত পৌঁছেছে বলে জানা গেছে।
সম্প্রতি মাগুরার এক যুবদল নেতার মাধ্যমে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে একটি অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়, নিরীক্ষা ও পরিদর্শন অধিদপ্তরের (ডিআইএ) এক শিক্ষা পরিদর্শকের বদলির আদেশ বাতিলের আশ্বাস দিয়ে মাউশির এক কর্মকর্তা দালালের মাধ্যমে ২০ লাখ টাকা গ্রহণ করেন। পরে ওই বদলি বাতিল না হলেও অভিযোগকারী অর্থ ফেরত পাননি বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো অনুমোদন এবং নিরীক্ষা আপত্তি নিষ্পত্তির ক্ষেত্রেও অনিয়ম ও ঘুষের অভিযোগ রয়েছে। ডিআইএর এক কর্মকর্তা দাবি করেন, সচিবালয়ের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের করিডরজুড়ে বর্তমানে শতাধিক দালাল সক্রিয়ভাবে ঘোরাফেরা করছেন।
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের হিসাব শাখার এক উপপরিচালকের বিরুদ্ধে স্কুলের ফাইল আটকে রেখে ঘুষ দাবির লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন রাজধানীর কল্যাণপুরের লরিয়াল হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক মো. মোশারফ হোসেন।
অভিযোগে তিনি উল্লেখ করেন, বোর্ডের এক বিদ্যালয় পরিদর্শক ও তার এক অফিস সহকারীকে নিয়ে একটি সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। তাদের দাবি অনুযায়ী অর্থ পরিশোধ না করলে বিদ্যালয়ের কোনো ফাইল অনুমোদন দেওয়া হয় না।
প্রধান শিক্ষক তার অভিযোগের অনুলিপি শিক্ষামন্ত্রী, শিক্ষাসচিব, মাউশির মহাপরিচালক এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সচিবের কাছেও পাঠিয়েছেন। তবে অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা ফোন রিসিভ করেননি।
২০২৭ শিক্ষাবর্ষের বিনামূল্যের পাঠ্যবই ছাপানোর দরপত্র নিয়েও অভিযোগ উঠেছে। দাবি করা হয়েছে, ই-টেন্ডারে প্রতি ফর্মার প্রাক্কলিত মূল্য ৩০ থেকে ৪৫ পয়সা বাড়ানো এবং সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দর নির্ধারণের কারণে সরকারের প্রায় ৫০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হতে পারে।
এ বিষয়ে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা বলেন, “যুদ্ধ পরিস্থিতি ও দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে গতবার পাঠ্যবই ছাপানোর টেন্ডারে প্রাক্কলিত দর কিছুটা কম ছিল। এবার পর্যালোচনা কমিটির সুপারিশে দর সামান্য বেড়েছে।”
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল অভিযোগগুলো অস্বীকার করে বলেন, “মাউশির বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে, তার কোনো ভিত্তি নেই।”
