ভুয়া বিশেষজ্ঞ মূল্যায়ন, তথ্যের অসংগতি, চৌর্যবৃত্তি এবং গবেষণা প্রকাশে নানা ধরনের অনিয়মের অভিযোগে ২০১৯ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত বাংলাদেশি গবেষকদের সম্পৃক্ত অন্তত ৩২৫টি গবেষণাপত্র আন্তর্জাতিক সাময়িকী থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। গবেষকদের মতে, এ ধরনের ঘটনা দেশের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির জন্য উদ্বেগজনক।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান খানের ২৬টি গবেষণাপত্র বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জার্নাল প্রত্যাহার করেছে। এর মধ্যে ছয়টিতে তিনি প্রধান লেখক এবং বাকিগুলোতে সহলেখক ছিলেন। প্রকাশকদের ভাষ্য অনুযায়ী, ভুয়া পিয়ার রিভিউ, তথ্যগত অসংগতি ও চৌর্যবৃত্তিসহ বিভিন্ন অনিয়মের কারণে এসব গবেষণা বাতিল করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রত্যাহার হওয়া ৩২৫টি গবেষণাপত্রের মধ্যে ৪৪টি ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ৪২টি নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়, ৩২টি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, ২১টি ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি (ইউআইইউ) এবং ২০টি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। এছাড়া চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়সহ আরও কয়েকটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গবেষকদের নামও এই তালিকায় রয়েছে।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, গবেষণাপত্রগুলো প্রত্যাহারের প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে পিয়ার রিভিউ প্রক্রিয়ায় কারচুপি, গবেষণার তথ্য ও ফলাফলে অসংগতি, প্লেজিয়ারিজম, একই তথ্য পুনর্ব্যবহার এবং অপ্রাসঙ্গিক উদ্ধৃতির মাধ্যমে সাইটেশন বাড়ানোর চেষ্টা। কিছু ক্ষেত্রে অর্থের বিনিময়ে লেখকত্ব বেচাকেনার অভিযোগও উঠে এসেছে।
অধ্যাপক মনিরুজ্জামান খান অবশ্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি দাবি করেন, একাধিক পর্যালোচকের মূল্যায়ন ও সংশোধনের পরই গবেষণাগুলো প্রকাশিত হয়েছিল এবং প্রকাশকেরা গবেষকদের মতামত যথাযথ গুরুত্ব দেননি। অন্যদিকে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল ও পদার্থবিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক সাজ্জাদ হোসাইন বলেন, স্বল্প সময়ে বিপুলসংখ্যক গবেষণা প্রকাশের বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছেও অস্বাভাবিক মনে হয়েছিল এবং তখনই সংশ্লিষ্ট শিক্ষককে সতর্ক করা হয়েছিল।
অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির কয়েকজন গবেষকের অন্তত ৪৪টি গবেষণাপত্র প্রত্যাহার হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট গবেষকদের দেওয়া আর্থিক প্রণোদনা ফেরত নেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে।
এদিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির কয়েকজন শিক্ষকের গবেষণাপত্রও বিভিন্ন অভিযোগে আন্তর্জাতিক প্রকাশনা থেকে প্রত্যাহার হয়েছে। সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের কেউ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন, আবার কেউ অনিয়মের বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।
গবেষণা প্রত্যাহারের ঘটনায় জবাবদিহির ঘাটতির বিষয়টিও সামনে এসেছে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক মামুন আহমেদ বলেন, কোনো শিক্ষক বা গবেষকের বিরুদ্ধে জালিয়াতির অভিযোগ উঠলে প্রথমে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়কে তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় ব্যর্থ হলে ইউজিসি নিজেই তদন্ত করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
