রাজনৈতিক কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞার মধ্যে সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক পুনর্গঠন ও তৃণমূল পর্যায়ে নেতাকর্মীদের সক্রিয় করে রাজনীতিতে ফেরার কৌশল নিয়ে এগোচ্ছে আওয়ামী লীগ। দলীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে বড় ধরনের পরিবর্তন না এনে ইউনিয়ন, ওয়ার্ড, উপজেলা ও থানা পর্যায়ে নতুন কমিটি গঠন, দায়িত্ব পুনর্বণ্টন এবং অনলাইনভিত্তিক যোগাযোগ জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে বিচ্ছিন্ন কর্মসূচি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতা হারানোর পর আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করছেন। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছে। দলীয় সূত্র জানায়, তিনি বিদেশে অবস্থান করেও ভার্চ্যুয়াল মাধ্যমে বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন এবং সাংগঠনিক বিষয়ে দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন।
দলীয় একাধিক সূত্রের দাবি, দেশের অন্তত ১৭টি জেলার বিভিন্ন উপজেলা, থানা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে নতুন কমিটি গঠন অথবা দায়িত্ব পুনর্বণ্টন করা হয়েছে। কোথাও আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়েছে, আবার কোথাও ‘সমন্বয়কারী’ বা ‘দায়িত্বপ্রাপ্ত’ হিসেবে নেতৃত্ব নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব কমিটির বেশিরভাগই অনলাইনের মাধ্যমে অনুমোদন বা ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ গত ডিসেম্বরে শেষ হলেও নতুন কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব নির্বাচন বা সাংগঠনিক সংস্কারের বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেই। বরং বিদ্যমান নেতৃত্ব বহাল রেখে মাঠপর্যায়ের সাংগঠনিক কাঠামো সচল রাখার দিকেই গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
দলীয় সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন কমিটিতে নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে—কারাগার থেকে জামিনে মুক্ত হয়ে সাংগঠনিক কাজে সক্রিয় হওয়া নেতাকর্মী, এলাকায় অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম ব্যক্তি, স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী নেতৃত্ব এবং কারাগারে থাকা বা দেশের বাইরে অবস্থানরত নেতাদের আর্থিক সহায়তা দিতে সক্ষম ব্যক্তিদের বিবেচনায় রাখা।
জুলাই মাসে ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের অধীন কয়েকটি থানা এবং একাধিক ওয়ার্ডে নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। একই সময়ে ছাত্রলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের বিভিন্ন ইউনিটেও নতুন কমিটি গঠনের তথ্য পাওয়া গেছে।
দলীয় নেতাদের মতে, বর্তমানে টেলিগ্রামসহ বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায়ের অনেক নেতাও সরাসরি শেখ হাসিনার সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ পাচ্ছেন। এতে প্রচলিত সাংগঠনিক ধাপের বাইরে নতুন কিছু মুখ সামনে এলেও দলীয় কাঠামোর ভেতরে কিছু অস্বস্তির সৃষ্টি হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আওয়ামী লীগের এক নেতা বলেন, “থানা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের কম পরিচিত নেতারাও এখন অনলাইনে শেখ হাসিনার সঙ্গে যুক্ত হতে পারছেন। এর ফলে তাঁরা অনেক ক্ষেত্রে জেলা, মহানগর কিংবা কেন্দ্রীয় পর্যায়ের নেতাদের গুরুত্ব দিতে চাইছেন না।”
দলীয় সূত্র বলছে, বর্তমানে সাংগঠনিক মূল্যায়নের ক্ষেত্রে ঝটিকা মিছিল আয়োজনের সক্ষমতা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয়তা এবং ভার্চ্যুয়াল বৈঠকে অংশগ্রহণকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। শেখ হাসিনাও দলীয় নেতাদের উদ্দেশে সংকটকালে সক্রিয় থাকা ব্যক্তিদের নেতৃত্বে আনার নির্দেশনা দিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
দলটির একাধিক দায়িত্বশীল নেতা মনে করছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের প্রধান লক্ষ্য সাংগঠনিক অস্তিত্ব ধরে রাখা এবং অনুকূল রাজনৈতিক পরিবেশের অপেক্ষা করা। শেখ হাসিনার ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণাকেও তৃণমূলের নেতাকর্মীদের উজ্জীবিত করার কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শুধু তৃণমূলে কমিটি পুনর্গঠন, বিচ্ছিন্ন কর্মসূচি কিংবা অনলাইন প্রচারণার মাধ্যমে দলটি কতটা কার্যকরভাবে রাজনীতিতে ফিরতে পারবে, তা এখনো অনিশ্চিত। একই সঙ্গে অতীতের কর্মকাণ্ড নিয়ে আত্মসমালোচনা ও সাংগঠনিক সংস্কার ছাড়া হারানো জনসমর্থন পুনরুদ্ধার কতটা সম্ভব হবে, সে প্রশ্নও রয়ে গেছে।
