মেঘে মোড়া সবুজ পাহাড়, সীমান্তঘেঁষা বিস্তীর্ণ প্রান্তর, নদীর শান্ত স্রোত আর প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যে ঘেরা সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার মিনাটিলা এখন পর্যটকদের নতুন আকর্ষণে পরিণত হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর অনেকেই এলাকাটিকে ‘মিনি সুইজারল্যান্ড’ নামে অভিহিত করছেন। তবে স্থানীয়দের দাবি, পর্যটনের সম্ভাবনা থাকলেও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও সুযোগ-সুবিধার অভাব এখনো রয়ে গেছে।
শ্রাবণের এক বিকেলে মিনাটিলায় গেলে চোখে পড়ে প্রকৃতির মনোমুগ্ধকর রূপ। সীমান্তের ওপারে সবুজে ঢাকা পাহাড়ের সারি, আকাশজুড়ে ভেসে থাকা কালো মেঘ আর নিচে বিস্তৃত সবুজ মাঠ এক অনন্য পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। মাঠে গরু-মহিষ চরাচ্ছেন রাখালরা, পাশ দিয়ে বয়ে চলা রাংপানি নদে সাদা ও ধূসর রঙের হাঁসের দল জলকেলিতে মেতে উঠেছে।
সিলেট-তামাবিল আঞ্চলিক মহাসড়কের ৪ নম্বর বাংলাবাজার এলাকা থেকে ডান পাশের একটি গ্রামীণ সড়ক ধরে প্রায় দেড় কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে ঝিঙ্গাবাড়ি গ্রাম হয়ে পৌঁছাতে হয় মিনাটিলায়। কখনো ইটের, কখনো কাঁচা রাস্তা পেরিয়ে সীমান্তবর্তী এই স্থানে পৌঁছানো যায়।
গ্রামের শেষ প্রান্ত থেকে কয়েক শ গজ দূরেই রয়েছে আন্তর্জাতিক সীমান্তের শূন্যরেখা। মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্যের কারণে সাম্প্রতিক সময়ে ফেসবুক ও টিকটকে মিনাটিলার বিভিন্ন ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। এর ফলে স্থানীয়দের কাছে এলাকাটি ‘ভাইরাল মাঠ’ নামেও পরিচিতি পেয়েছে।
মিনাটিলার এক পাশে প্রবাহিত রাংপানি নদ, অন্য পাশে সবুজ গ্রাম, কৃষিজমি, সবজিখেত ও ধানের চারা। সীমান্ত পিলারের ওপারে ভারতের সবুজ পাহাড় প্রাকৃতিক দেয়ালের মতো দাঁড়িয়ে আছে। পাহাড়ের পাদদেশে রয়েছে কাঁটাতারের বেড়া। ভারতের ছাগলখাউরি নদ বাংলাদেশে প্রবেশ করে রাংপানি নামে পরিচিত হয়েছে। নদীতে স্থানীয় শ্রমিকদের বারকি নৌকায় বালু পরিবহন করতেও দেখা যায়। ভারতীয় অংশে মিকিরবস্তি গ্রামের পাশ দিয়ে ছাগলখাউরি নদের ওপর একটি ঝুলন্ত সেতুও রয়েছে।
বাংলাদেশ অংশে ছোট্ট সবুজ মাঠে দুটি ফুটবল পোস্ট স্থাপন করা হয়েছে। নদীর তীরজুড়ে লাগানো হয়েছে বিভিন্ন গাছের চারা। দর্শনার্থীদের বসার জন্য মাঠের এক কোণে বাঁশ ও কাঠ দিয়ে তৈরি করা হয়েছে অস্থায়ী বেঞ্চ। সেখানে স্থানীয় কিশোর ও তরুণদের আড্ডাও চোখে পড়ে।
মিনাটিলার পাশের আসামপাড়া গ্রামের ক্রীড়া সংগঠক শাহ আবদুল জব্বার বলেন, আগে এ এলাকায় স্থানীয়দের বাইরে খুব কম মানুষ আসতেন। কিন্তু এখন ছুটির দিনগুলোতে আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকে অনেকেই ছবি তুলতে ও প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে আসেন। তবে পর্যটকদের জন্য শৌচাগার, উন্নত সড়ক ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো না থাকায় ভোগান্তি পোহাতে হয়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, পরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়া হলে মিনাটিলা দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় প্রকৃতিভিত্তিক পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।
এ বিষয়ে জৈন্তাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুনন্দা রায় বলেন, “জায়গাটি এখনো পর্যটকদের কাছে খুব বেশি পরিচিত নয়। তবে এরপরও অনেকেই মিনাটিলায় বেড়াতে যান। সীমান্তবর্তী এলাকা হওয়ায় কিছুটা বাধ্যবাধকতা আছে; তবে জায়গাটিকে কীভাবে পর্যটকবান্ধব করা যায়, এর পরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়া হবে।”
দিন শেষে সূর্য পশ্চিমে ঢলে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে পাহাড়ের গায়ে আরও ঘন হয়ে নামে মেঘ। আর রাংপানি নদ নিজের স্বাভাবিক ছন্দে বয়ে চলে, রেখে যায় সীমান্তঘেরা মিনাটিলার অনন্য সৌন্দর্যের দীর্ঘস্থায়ী স্মৃতি।
