রাশিয়ার ক্রেতা এফইএস রিটেইলের মাধ্যমে সরবরাহ করা পোশাকের প্রায় ৪ কোটি মার্কিন ডলার বকেয়া নিয়ে বিরোধের জেরে বাংলাদেশে নতুন ক্রয়াদেশ ও নতুন পণ্য উন্নয়ন কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে পোল্যান্ডের পোশাক ব্র্যান্ড এলপিপি। এদিকে বকেয়া পরিশোধ না করলে প্রতিষ্ঠানটিকে কালোতালিকাভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিকেএমইএ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে অভিযোগ জানানোর ঘোষণা দিয়েছে সংগঠনটি।
বাংলাদেশ থেকে নতুন পোশাকের ক্রয়াদেশ দেওয়া এবং নতুন পণ্য উন্নয়ন কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে পোল্যান্ডভিত্তিক ফ্যাশন ব্র্যান্ড এলপিপি (LPP)। সংশ্লিষ্ট রপ্তানিকারকদের দাবি, রাশিয়ার প্রতিষ্ঠান এফইএস রিটেইল–এর মাধ্যমে সরবরাহ করা তৈরি পোশাকের প্রায় ৪ কোটি মার্কিন ডলার বকেয়া অর্থকে কেন্দ্র করেই এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
রপ্তানিকারকদের ভাষ্য অনুযায়ী, এলপিপির নিশ্চয়তায় রাশিয়ার বাজারের জন্য বাংলাদেশি পোশাক কারখানা ও বায়িং হাউসগুলো এফইএস রিটেইলের কাছে পণ্য সরবরাহ করেছিল। তবে পণ্য সরবরাহের পরও গত বছর থেকে প্রতিষ্ঠানটি অর্থ পরিশোধ করেনি। একই সঙ্গে এলপিপিও এ দায় স্বীকার করতে অস্বীকৃতি জানায়।
রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়ায় সরাসরি ব্যবসা পরিচালনায় জটিলতায় পড়ে এলপিপি। এরপর তাদের ঢাকা কার্যালয়ের মাধ্যমে এফইএস রিটেইলকে ব্যবহার করে বাংলাদেশি সরবরাহকারীদের কাছে ক্রয়াদেশ দেওয়া শুরু হয়। শুরুতে অর্থ পরিশোধে সমস্যা না হলেও পরে বকেয়া বাড়তে থাকে।
বিষয়টির সমাধানে কয়েকটি পোশাক কারখানা ও বায়িং হাউস আদালতের শরণাপন্ন হয়। গত মাসে বিকেএমইএ ও গার্মেন্ট বায়িং হাউস মালিকদের সংগঠন বিজিবিএর সঙ্গে এলপিপির কর্মকর্তাদের বৈঠক হলেও মামলা প্রত্যাহারের শর্তে সমঝোতার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় কোনো সমাধান হয়নি।
গত ২১ জুলাই বিজিএমইএ, বিকেএমইএ ও বিজিবিএকে পাঠানো এক চিঠিতে এলপিপি জানায়, অর্থ পরিশোধসংক্রান্ত বিরোধে তারা চুক্তিগতভাবে দায়ী নয়। তবে তারা আলোচনায় অংশ নিয়েছে এবং মধ্যস্থতার চেষ্টা করেছে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশ থেকে ক্রয়াদেশ ধীরে ধীরে কমিয়ে আনার পরিকল্পনার কথাও জানায়। যদিও ভবিষ্যতে পরিস্থিতির উন্নতি হলে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার ইঙ্গিত দেয়।
এরপর ৩০ জুলাই বাংলাদেশের সরবরাহকারীদের কাছে পাঠানো আরেকটি চিঠিতে এলপিপি জানায়, ভবিষ্যৎ সোর্সিং কৌশল পুনর্মূল্যায়ন শেষ না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশে নতুন ক্রয়াদেশ এবং নতুন পণ্য উন্নয়ন কার্যক্রম স্থগিত থাকবে। পাশাপাশি অন্যান্য দেশের উৎপাদন সক্ষমতা ও সোর্সিং সুযোগও পর্যালোচনা করা হবে।
বিজিবিএর সভাপতি আবদুল হামিদ জানান, তাঁদের সংগঠনের ৯টি প্রতিষ্ঠানেরই প্রায় ৪৫ লাখ মার্কিন ডলার পাওনা রয়েছে। সব মিলিয়ে বাংলাদেশি সরবরাহকারীদের বকেয়া দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪ কোটি ডলার।
তিনি বলেন, রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের পর এলপিপির কর্মকর্তারাই বাংলাদেশি সরবরাহকারীদের সঙ্গে এফইএস রিটেইলের পরিচয় করিয়ে দেন। এমনকি এলপিপির কার্যালয় থেকেই ক্রয়াদেশ দেওয়া হতো এবং অর্থ পরিশোধের নিশ্চয়তাও দেওয়া হয়েছিল। অথচ এখন প্রতিষ্ঠানটি দাবি করছে, এফইএস রিটেইলের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই।
তার ভাষ্য, এলপিপি প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৮০ কোটি মার্কিন ডলারের তৈরি পোশাক কেনে। ব্যবসা অব্যাহত থাকুক সেটিই চান সরবরাহকারীরা, তবে বকেয়া পরিশোধ এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয়।
তিনি আরও জানান, এলপিপি এফইএস রিটেইলের মাধ্যমে বকেয়া অর্থের ৫০ শতাংশ ছাড়ে নিষ্পত্তির প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু ব্যাংকের কাছে বড় অঙ্কের দায় থাকায় সেই প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য হয়নি।
এনসা ক্লোথিং নামের একটি বায়িং হাউস গত বছরের এপ্রিলে এফইএস রিটেইলের একটি ক্রয়াদেশের বিপরীতে ৫২ হাজার মার্কিন ডলার মূল্যের ট্রাউজার রপ্তানি করে। কিন্তু অর্থ পরিশোধ না হওয়ায় পণ্যটি এখনও রাশিয়ার বন্দরে পড়ে রয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এনামুল কবির বলেন, এলপিপি দাবি করছে, গত বছরের এপ্রিলের পর এফইএস রিটেইলের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক নেই। কিন্তু একই বছরের এপ্রিল ও মে মাসে ওই প্রতিষ্ঠানের জন্য রপ্তানি করা পণ্যের অর্থ এলপিপিই পরিশোধ করেছিল। তিনি সতর্ক করে বলেন, দ্রুত অর্থ না পেলে সংশ্লিষ্ট উৎপাদনকারী কারখানাটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
গত শনিবার অনুষ্ঠিত বিকেএমইএর পরিচালনা পর্ষদের সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে, এলপিপি যদি বাংলাদেশি পোশাক কারখানা ও বায়িং হাউসগুলোর বকেয়া অর্থ পরিশোধ না করে, তাহলে প্রতিষ্ঠানটিকে কালোতালিকাভুক্ত করা হবে।
বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়ে এলপিপি এক ধরনের চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করেছে। তিনি জানান, বকেয়া পরিশোধ না করলে ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে অনৈতিক ব্যবসায়িক আচরণের অভিযোগ জানানো হবে।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, শুধু এফইএস রিটেইলের মাধ্যমে নয়, এলপিপির সরাসরি দেওয়া কিছু ক্রয়াদেশের ক্ষেত্রেও পণ্য সরবরাহের পর অর্থ পরিশোধ না করার অভিযোগ রয়েছে।
