দীর্ঘদিন গোপন বন্দিত্বে থাকা মিয়ানমারের সাবেক রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা ও নোবেলজয়ী নেত্রী অং সান সু চির সঙ্গে আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটির (আইসিআরসি) এক প্রতিনিধির বৈঠক হয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির সামরিক সরকার। সু চির স্বাস্থ্য ও অবস্থান নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগের মধ্যেই সোমবার এই বৈঠকের খবর প্রকাশ করা হয়।
মিয়ানমারের রাজধানী নেপিডোতে আইসিআরসির আবাসিক প্রতিনিধি আরনো দ্য বেকের সঙ্গে অং সান সু চির সাক্ষাৎ হয়েছে বলে জানিয়েছেন সরকারের মুখপাত্র। তবে বৈঠকে কী বিষয়ে আলোচনা হয়েছে কিংবা সু চির শারীরিক অবস্থার বিষয়ে কোনো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে অং সান সু চির নেতৃত্বাধীন নির্বাচিত বেসামরিক সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে সেনাবাহিনী। এরপর থেকেই তিনি বিভিন্ন মামলায় সাজাপ্রাপ্ত অবস্থায় বন্দী রয়েছেন এবং তাঁর অবস্থান ও স্বাস্থ্য নিয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া অত্যন্ত সীমিত।
সরকারি মুখপাত্র খাইন খাইন সোয়ে টেলিগ্রামে দেওয়া এক বার্তায় জানান, সোমবার নেপিডোতে আইসিআরসির প্রতিনিধি আরনো দ্য বেকের সঙ্গে সু চির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটির সঙ্গে যোগাযোগ করেছে দ্য ইনডিপেনডেন্ট।
আটকের পর থেকে অং সান সু চি কোথায় আছেন এবং তাঁর স্বাস্থ্য কেমন—এ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ রয়েছে। এই সময়ের মধ্যে কোনো বিদেশি রাষ্ট্রনেতা বা কূটনীতিকের সঙ্গে তাঁর প্রকাশ্য সাক্ষাতের তথ্যও পাওয়া যায়নি।
গত এপ্রিলের শেষ দিকে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের পর সাবেক জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইং প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেন। এরপর সামরিক কর্তৃপক্ষ জানায়, সু চিকে গোপন কারাগার থেকে সরিয়ে গৃহবন্দী অবস্থায় রাখা হয়েছে।
এর আগে ৩০ এপ্রিল রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে সু চির একটি ছবি প্রকাশ করা হলেও সেটির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ছবিতে তাঁকে দুই ইউনিফর্মধারী কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলতে দেখা যায়।
ছবি প্রকাশের পর সু চির ছেলে কিম অ্যারিস আবারও তাঁর মায়ের জীবিত থাকার স্বাধীন ও বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ প্রকাশের দাবি জানান।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লেখেন, “সামরিক অভ্যুত্থানের পর পাঁচ বছরের বেশি সময় পার হলেও আমার মায়ের জীবিত থাকার কোনো স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি।”
তিনি আরও বলেন, “আমার ৮১ বছর বয়সী মাকে এক গোপন স্থান থেকে আরেক গোপন স্থানে সরিয়ে নেওয়াকে স্বাধীনতা বলা যায় না। তিনি এখনো জিম্মি। তিনি যে জীবিত আছেন, তার প্রমাণ দেখান।”
কিম অ্যারিসের অভিযোগ, গৃহবন্দী করার ঘোষণা দিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি অন্যদিকে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছে জান্তা সরকার। তাঁর ভাষায়, এরপরও পরিবার বারবার জানতে চেয়েছে সু চি কোথায় আছেন, কেমন আছেন এবং তিনি আদৌ সুস্থ আছেন কি না।
সম্প্রতি মিন অং হ্লাইংকে ভারতের দেওয়া আনুষ্ঠানিক অভ্যর্থনা নিয়েও হতাশা প্রকাশ করেন তিনি। একই সঙ্গে বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে মানবাধিকার ইস্যুতে ভারতের আরও দৃঢ় ভূমিকার আহ্বান জানান।
দুর্নীতি, নির্বাচনী জালিয়াতিতে উসকানি এবং রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা আইন লঙ্ঘনসহ বিভিন্ন অভিযোগে অং সান সু চিকে মোট ৩৩ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। তবে চলতি বছরের শুরুতে দুটি সাধারণ ক্ষমা কর্মসূচির আওতায় তাঁর সাজা কমিয়ে ১৮ বছর করা হয়। একই সঙ্গে তাঁকে নির্জন কারাবাস থেকে সরিয়ে গৃহবন্দী অবস্থায় রাখা হয়েছে বলে জানায় মিয়ানমারের কর্তৃপক্ষ।
সোমবারের এই বৈঠক সু চির বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে আন্তর্জাতিক মহলের আগ্রহ আরও বাড়িয়েছে। তবে তাঁর স্বাস্থ্য, অবস্থান এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
