বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কদের হেফাজতে নেওয়া এবং তাঁদের খাবার খাওয়ানোর ছবি প্রকাশ নিয়ে তৎকালীন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) প্রধান হারুন অর রশীদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের একটি ফোনালাপের তথ্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ উপস্থাপন করেছে রাষ্ট্রপক্ষ। বুধবার (১২ আগস্ট) জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাত শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে যুক্তিতর্কের সময় ফোনালাপটি জমা দেওয়া হয়।
বুধবার বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেলে মামলাটির যুক্তিতর্ক চলছে। রাষ্ট্রপক্ষের হয়ে ষষ্ঠ দিনের মতো সমাপনী বক্তব্য উপস্থাপন করছেন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। এরপর পলাতক আসামিদের পক্ষে সরকারি খরচে নিয়োগ পাওয়া স্টেট ডিফেন্স আইনজীবীরা তাঁদের যুক্তি তুলে ধরবেন।
রাষ্ট্রপক্ষের উপস্থাপিত ফোনালাপে দেখা যায়, আন্দোলন চলাকালে হেফাজতে নেওয়া আন্দোলনের সমন্বয়কদের খাবার খাওয়ানোর ছবি প্রকাশের বিষয়টি নিয়ে হারুন অর রশীদের কাছে ক্ষোভ প্রকাশ করেন ওবায়দুল কাদের। কাদের তাঁকে প্রশ্ন করেন, ভালো কাজ করার পরও খাবার খাওয়ানোর ছবি কেন তোলা ও প্রকাশ করা হলো।
জবাবে হারুন দাবি করেন, খাবার খাওয়ানোর সিদ্ধান্ত তাঁর একক সিদ্ধান্ত ছিল না। তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও এসবির প্রধানের নির্দেশেই খাবার দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল বলে তিনি জানান। ছবি তোলা ও বিবৃতি প্রকাশের ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ ছিল বলে ফোনালাপে দাবি করেন হারুন।
কথোপকথনে ওবায়দুল কাদের ছবিটি নিজের কাছে রেখে দেওয়ার কথা বলেন। হারুন তখন জানান, এসবির প্রধান মনিরসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ছবি প্রকাশের নির্দেশ দিয়েছিলেন।
ফোনালাপে হারুন আরও বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাসায় নিয়মিত বৈঠক হতো এবং সেখান থেকে যে নির্দেশ দেওয়া হতো, তিনি তা-ই পালন করতেন। একজন ডিবি প্রধান হিসেবে তাঁর এককভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ সীমিত বলেও তিনি কাদেরকে জানান।
হেফাজতে থাকা ছয়জনের নিরাপত্তার বিষয়ে কাদের জানতে চাইলে হারুন বলেন, এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠকে যে সিদ্ধান্ত দেওয়া হতো, তিনি সেটিই বাস্তবায়ন করতেন। তাঁরা সেখানেই ছিলেন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
ফোনালাপে নিজের বদলির প্রসঙ্গও তোলেন হারুন। তিনি বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কমিশনারকে তাঁর বদলির কথা জানিয়েছেন। এ অবস্থায় তাঁর ‘অপরাধটা কী’—কাদেরের কাছে তা জানতে চান তিনি।
হারুন আরও দাবি করেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইজিপির নির্দেশের বাইরে তাঁরা কোনো কাজ করেননি। এ বিষয়ে প্রমাণ নেওয়ার জন্য কাদেরকে অনুরোধও করেন তিনি। কাদের তখন বলেন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এখন এসব নির্দেশের কথা স্বীকার করছেন না। জবাবে হারুন তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করে বিষয়টি যাচাই করার কথা বলেন।
কথোপকথনের শেষদিকে হারুন কাদেরকে দ্রুত বিষয়টি দেখার অনুরোধ করেন। তিনি বলেন, ব্যবস্থা না নিলে তাঁর বিরুদ্ধে আদেশ হয়ে যেতে পারে এবং তিনি ডিবিতে থাকবেন না। কাদের তখন বিষয়টি দেখার আশ্বাস দেন।
ওবায়দুল কাদের ছাড়া এ মামলার অন্য আসামিরা হলেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন এবং সাধারণ সম্পাদক ওয়ালি আসিফ ইনান।
মামলার সাত আসামিই বর্তমানে পলাতক।
