কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান ইশায়াত শাহরিয়ার ওরফে অপ্রতিমকে আইফোন ছিনিয়ে নিতে হত্যা করা হয়েছে—পুলিশের এমন ব্যাখ্যা মানতে নারাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। হত্যাকাণ্ডের পেছনে অন্য কোনো কারণ বা সংশ্লিষ্টতা আছে কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) দুপুরে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের গোলচত্বরে অপ্রতিম হত্যার প্রতিবাদ ও সুষ্ঠু বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন করেন শিক্ষার্থীরা। পরে সংবাদ সম্মেলনে তাঁরা পুলিশের তদন্ত নিয়েও বিভিন্ন প্রশ্ন তোলেন।
গতকাল রোববার কুমিল্লা জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান দাবি করেন, মায়ের আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে অপ্রতিমকে পরিকল্পিতভাবে লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার একটি নির্জন জঙ্গলে নিয়ে যাওয়া হয়।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার সময় অপ্রতিম বাধা দিলে তাঁকে বাঁশের লাঠি দিয়ে মাথায় আঘাত করা হয়। পরে তাঁর মৃত্যু নিশ্চিত হলে ফোনটি নিয়ে তিনজন ঘটনাস্থল থেকে চলে যান। এ ঘটনায় হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত তিনজনসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
শিক্ষার্থী ও জাতীয় ছাত্রশক্তি কুমিল্লা দক্ষিণ জেলার আহ্বায়ক নাঈম ভূঁইয়া বলেন, অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার পর পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তাঁর ভাষ্য, ১৯ সেপ্টেম্বর রাত ১১টার দিকে অপ্রতিমের মা সদর দক্ষিণ থানায় ছেলের নিখোঁজের বিষয়ে সাধারণ ডায়েরি করেন। এরপর পুলিশ যথাযথ তৎপরতা দেখিয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
শিক্ষার্থীরা আরও দাবি করেন, অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের পর ঘটনাস্থলে ফরেনসিক দলের পৌঁছাতে কয়েক ঘণ্টা সময় লেগেছে বলে তাঁরা জানতে পেরেছেন। এত সময় পর আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তাঁরা।
এ কারণে পুলিশ সুপার এবং সদর দক্ষিণ ও আদর্শ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের প্রত্যাহারের দাবিও জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। নিখোঁজ ব্যক্তিদের উদ্ধারে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তাঁরা।
শিক্ষার্থীদের সংবাদ সম্মেলনে আনাস নামের এক তরুণকে আটক করে পরে ছেড়ে দেওয়ার বিষয়টিও উঠে আসে।
শিক্ষার্থী কাজী মিরাজ বলেন, পুলিশ সুপারের সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়েছে, আনাস নামে কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আরেকটি ইউনিট এসআরবির বক্তব্যে আনাসকে আটক করে পরে ছেড়ে দেওয়ার কথা এসেছে।
দুই ধরনের বক্তব্যে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে উল্লেখ করে তিনি প্রশ্ন করেন, আনাসকে আটক করা হয়ে থাকলে তাঁকে কেন ছেড়ে দেওয়া হলো এবং অপ্রতিম হত্যার সঙ্গে তাঁর কোনো সংশ্লিষ্টতা ছিল কি না, তা তদন্ত করা হয়েছে কি না।
অপ্রতিমের কাছে থাকা আইফোনই হত্যাকাণ্ডের একমাত্র কারণ—পুলিশের এই বক্তব্য নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন শিক্ষার্থীরা।
কাজী মিরাজ বলেন, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের জীবনযাপন, তাঁদের কাছে থাকা দামি মুঠোফোন ও মোটরসাইকেলের বিষয়গুলোও তদন্তে বিবেচনায় নেওয়া উচিত। গ্রেপ্তার তুহিনের বিরুদ্ধে আগে মোটরসাইকেল চুরির অভিযোগ ছিল বলেও তিনি উল্লেখ করেন। এসব বিষয়ের সঙ্গে অপ্রতিম হত্যার কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে বের করার দাবি জানান তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদলের সদস্যসচিব মোহাম্মদ আবুল বাশার বলেন, প্রশাসনের পক্ষ থেকে তদন্তের স্বার্থে কিছু তথ্য এখনই প্রকাশ করা হচ্ছে না বলে তাঁদের জানানো হয়েছে। তদন্তে পাওয়া তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ সামনে আনার দাবি জানান তিনি।
অপ্রতিম গত শুক্রবার দুপুরে কুমিল্লার কোটবাড়ীর গন্ধমতী এলাকার ভাড়া বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয়। পরদিন শনিবার দুপুরে সদর দক্ষিণ উপজেলার বিজয়পুর ইউনিয়নের সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়ের নির্জন জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
অপ্রতিম কুমিল্লার বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।
শিক্ষার্থীরা অপ্রতিম হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করার দাবি জানিয়েছেন।
