দেশীয় স্পিনিং শিল্পের আপত্তি ও দীর্ঘদিনের মতপার্থক্যের মধ্যেই ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের বর্জ্য সুতা (ওয়েস্ট ইয়ার্ন) আমদানির সুযোগ দিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে এ সুবিধার অপব্যবহার ঠেকাতে আমদানিকারকদের ব্যাংক গ্যারান্টি দিতে হবে। আমদানি করা কাঁচামাল দিয়ে উৎপাদিত পণ্য সম্পূর্ণ রপ্তানি হওয়ার পরই ওই গ্যারান্টি অবমুক্ত করা হবে।
রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) জারি করা আদেশে এনবিআর জানিয়েছে, বাংলাদেশ কাস্টমস ট্যারিফের এইচএস কোড ৫৫০৫, ৫৫০৬ ও ৫২০৭-এর আওতাধীন ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের বর্জ্য সুতা বন্ড সুবিধায় আমদানি করা যাবে। তবে এই সুবিধা শুধু রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য প্রযোজ্য হবে।
এনবিআরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, স্থানীয় স্পিনিং মিলগুলোর স্বার্থ রক্ষা এবং রপ্তানিমুখী শিল্পে কাঁচামালের সরবরাহ নিশ্চিত করার মধ্যে ভারসাম্য আনতেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি ওয়েস্ট ইয়ার্ন আমদানি নিয়ে তৈরি পোশাক খাতের সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ এবং স্পিনিং মিল মালিকদের সংগঠন বিটিএমএর মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দেয়। পরে বিষয়টি নিয়ে গঠিত ওয়ার্কিং গ্রুপের সুপারিশের ভিত্তিতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে জানা গেছে।
এনবিআরের আদেশ অনুযায়ী, আমদানিকারককে অবশ্যই বিজিএমইএ বা বিকেএমইএর সদস্যভুক্ত রপ্তানিমুখী কারখানা হতে হবে। আমদানির আগে প্রযোজ্য শুল্ক ও করের সমপরিমাণ নিঃশর্ত ও অব্যাহতি-অযোগ্য ব্যাংক গ্যারান্টি সংশ্লিষ্ট কাস্টমস স্টেশনে জমা দিতে হবে।
শুল্কমুক্ত কাঁচামাল ব্যবহার করে উৎপাদিত পণ্য সম্পূর্ণ রপ্তানি হওয়ার পর লাইসেন্সিং কর্তৃপক্ষের প্রত্যয়নপত্রের ভিত্তিতে ব্যাংক গ্যারান্টি অবমুক্ত করা হবে।
খাতসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওয়েস্ট ইয়ার্ন তুলনামূলক কম দামের কাঁচামাল। এটি ব্যবহার করে নিম্ন ও মধ্যমূল্যের বিভিন্ন পোশাক, মোজা, নিটওয়্যার ও টেক্সটাইল পণ্য উৎপাদন করা হয়।
রপ্তানিকারকদের দাবি, স্থানীয় বাজারে প্রয়োজনীয় মান ও দামের কাঁচামাল সবসময় পাওয়া যায় না। তাই আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে বর্জ্য সুতা আমদানির সুযোগ প্রয়োজন।
বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর নেতারা দীর্ঘদিন ধরে এ সুবিধা চালুর দাবি জানিয়ে আসছিলেন। তাঁদের মতে, বৈশ্বিক বাজারে ক্রেতাদের মূল্যচাপ বাড়ছে। পাশাপাশি জ্বালানি, পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বিকল্প কাঁচামালের ব্যবহার অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে।
অন্যদিকে দেশীয় স্পিনিং মিল মালিকদের আশঙ্কা ছিল, নিয়ন্ত্রণহীন আমদানির সুযোগ দেওয়া হলে স্থানীয় সুতা উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বিশেষ করে কম দামের আমদানিকৃত বর্জ্য সুতা বাজারে প্রবেশ করলে দেশীয় কারখানাগুলোর উৎপাদন ও বিক্রিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার ঝুঁকি রয়েছে বলে তাঁরা মনে করেন।
এই পরিস্থিতিতে এনবিআর সরাসরি শুল্কমুক্ত আমদানির অনুমতি না দিয়ে ব্যাংক গ্যারান্টির শর্ত আরোপ করেছে। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, এতে আমদানিকৃত কাঁচামাল শুধু রপ্তানি পণ্য উৎপাদনে ব্যবহার হচ্ছে কি না, তা তদারকির সুযোগ থাকবে।
এনবিআরের আদেশ অনুযায়ী, কাস্টমস আইন, ২০২৩-এর ধারা ২৬৬-এর ক্ষমতাবলে সিদ্ধান্তটি কার্যকর করা হয়েছে। আদেশটি অবিলম্বে কার্যকর হবে। তবে আদেশ জারির তারিখের আগে দায়ের করা বিল অব এন্ট্রির ক্ষেত্রে নতুন সুবিধা প্রযোজ্য হবে না।
ব্যবসায়ীদের মতে, এ সিদ্ধান্তে রপ্তানিকারকরা কাঁচামাল সংগ্রহে কিছুটা স্বস্তি পাবেন। একই সঙ্গে ব্যাংক গ্যারান্টির শর্তের কারণে স্থানীয় শিল্পের উদ্বেগও আংশিকভাবে কমতে পারে। তবে সিদ্ধান্তটির বাস্তব প্রভাব নির্ভর করবে আমদানি তদারকি ও নির্ধারিত শর্ত কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা হয়, তার ওপর।
