‘আমি শুধু আমার মায়ের জন্য বেঁচে আছি এবং আজ এই অনুষ্ঠানের মঞ্চে উঠতে পেরেছি।’ কথাগুলো বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ছিল আনিকা কবির। তাঁর কথা শুনে আবেগে চোখ ছলছল করে ওঠে অনুষ্ঠানে উপস্থিত অন্যদেরও।
ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় বাবাকে হারান আনিকা। এরপর পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি জীবনধারণ করাও তাঁর জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। তবে নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি থেমে থাকেননি। জীবনের প্রথম পাবলিক পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জন করে সাফল্যের পরিচয় দিয়েছেন তিনি। সেই অর্জনের স্বীকৃতি পেয়ে অনুষ্ঠানে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করেন আনিকা।
সারা দেশে ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা দিচ্ছে প্রথম আলো। শিক্ষার ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ‘শিখো’র পৃষ্ঠপোষকতায় ‘স্বপ্ন দেখো জীবন গড়ো’ স্লোগানে ৬৪ জেলায় এই সংবর্ধনার আয়োজন করা হচ্ছে।
সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের রাজশাহী পর্ব শনিবার রাজশাহী শিক্ষা বোর্ড সরকারি মডেল স্কুল ও কলেজ মাঠে অনুষ্ঠিত হয়। সকাল আটটা থেকেই শিক্ষার্থীরা অনুষ্ঠানস্থলে আসতে শুরু করে। হাতে প্রথম আলোর ক্রেস্ট ও মাথায় লাল টুপি পরে পুরো মাঠে ছড়িয়ে পড়ে তারা।
জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের মূল পর্ব শুরু হয়। স্বাগত বক্তব্য দেন প্রথম আলোর রাজশাহীর নিজস্ব প্রতিবেদক আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ। তিনি প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমানের লিখিত বক্তব্য পড়ে শোনান। পরে শিক্ষার্থীদের মুখস্থ, মিথ্যা ও মাদককে ‘না’ বলার শপথ পাঠ করানো হয়।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সহ-উপাচার্য ও অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন খান শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, রাজশাহীর মেধাবী শিক্ষার্থীরাই এই সংবর্ধনায় অংশ নিয়েছে। তাঁদের সাফল্য দেশের পরিবর্তনের পথে আশাবাদ তৈরি করে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
রাজশাহী শিক্ষা বোর্ড সরকারি মডেল স্কুল ও কলেজের অধ্যক্ষ মো. শাহাদাত হোসেন সরকার বলেন, শিক্ষার্থীরা তথ্যপ্রযুক্তির যুগে বেড়ে উঠছে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তাদের সামনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তিনি এআইকে শুধু বিনোদনের কাজে ব্যবহার না করে দক্ষতা উন্নয়নে কাজে লাগানোর আহ্বান জানান। একই সঙ্গে দেশের প্রয়োজনে নিজেদের মেধা ও যোগ্যতা কাজে লাগানোর কথাও বলেন তিনি।
প্রথম আলোর উপসম্পাদক এ কে এম জাকারিয়া বলেন, পড়াশোনার পাশাপাশি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মতে, পেশাগত জীবনে প্রবেশের পর শিক্ষার্থীদের সামনে প্রকৃত চ্যালেঞ্জ শুরু হবে। তখন একাডেমিক শিক্ষার পাশাপাশি অন্যান্য বিষয় সম্পর্কে জ্ঞান অর্জনও প্রয়োজন, যা নেতৃত্বের জন্য প্রস্তুত হতে সহায়তা করে।
অনুষ্ঠানে আনিকা কবির ছাড়াও শিক্ষার্থীদের মধ্যে থেকে নিঝুম ও আরাফাত নিজেদের সাফল্যের গল্প তুলে ধরেন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন ঔড়ব আজাদ ও প্রীতি। আরও বক্তব্য দেন রাজশাহী ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল ও কলেজের শিক্ষক বদরুন নেসা।
সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে সাংস্কৃতিক পরিবেশনাও ছিল। বন্ধুসভার পক্ষ থেকে বেহালা বাজান ঔড়ব আজাদ। নৃত্য পরিবেশন করেন নুসরাত। সংগীত পরিবেশন করেন আনোয়ার হোসেন, পরোয়ার হোসেন, মালিহা ফারজানা ও শরিফুল ইসলাম।
অনুষ্ঠানে ঢাকা থেকে আসা শিল্পী অনীক সূত্রধর ‘পূর্ণতা’ গান পরিবেশন করেন। মঞ্চের সামনে দাঁড়িয়ে তাঁর সঙ্গে গান গাইছিলেন শিক্ষার্থী হুমায়রা তাপসী। বিষয়টি আয়োজকদের নজরে এলে তাঁকে মঞ্চে ডেকে নেওয়া হয় এবং হাতে একটি মাইক্রোফোন তুলে দেওয়া হয়। এরপর মূল শিল্পীর সঙ্গে গান গাইতে শুরু করেন তাপসী। তাঁর এই অংশগ্রহণ অনুষ্ঠানস্থলে থাকা অন্য শিক্ষার্থীদেরও আনন্দ দেয়।
প্রথম আলো ও ‘শিখো’র আয়োজনে অনুষ্ঠিত এই সংবর্ধনায় জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীরা তাঁদের সাফল্য উদ্যাপনের পাশাপাশি ভবিষ্যতের জন্য অনুপ্রেরণা ও বিভিন্ন দিকনির্দেশনা পাওয়ার সুযোগ পান।
