ইসলামিক স্টেট (আইএস)বিরোধী বৈশ্বিক জোটের কার্যক্রম শেষ হওয়ায় ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার সম্পন্ন হয়েছে। গত ৩০ সেপ্টেম্বর দুই বছরব্যাপী এই প্রত্যাহার প্রক্রিয়ার আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি হয়। এর মধ্য দিয়ে ইরাকের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় নতুন একটি অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে।
মার্কিন সেনা প্রত্যাহার উপলক্ষে ইরাকে চার দিনের সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়। তবে সেনা প্রত্যাহারের পর দেশটির নিরাপত্তা পরিস্থিতি, বিশেষ করে আইএসের তৎপরতা এবং আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ইরাক ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে ঘোষণা করেছিল, আইএসবিরোধী বৈশ্বিক জোটের কার্যক্রম দুই ধাপে গুটিয়ে নেওয়া হবে। প্রথম ধাপে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যে ইরাকের অভ্যন্তরে জোটের সব ধরনের যুদ্ধ ও অভিযান শেষ করার কথা ছিল।
দ্বিতীয় ধাপ চলে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। এর আওতায় সিরিয়ায় আইএসবিরোধী অভিযানে সহায়তা অব্যাহত রাখার পরিকল্পনা ছিল। গত জানুয়ারিতে ইরাক জানিয়েছিল, জোটের উপদেষ্টারা ফেডারেল এলাকাগুলো থেকে প্রত্যাহার সম্পন্ন করেছেন। তবে সিরিয়ায় অভিযানের জন্য প্রয়োজনীয় রসদ সহায়তা ইরবিলে অবস্থিত একটি ঘাঁটির মাধ্যমে চালু ছিল।
২০১৪ সাল থেকে আইএসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ইরাকি বাহিনীকে সহায়তা করে আসছিল মার্কিন সেনারা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উত্তর ইরাকে প্রায় ২ হাজার ৫০০ মার্কিন সেনা মোতায়েন ছিল। এর আগে ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের পর ২০০৭ সালে দেশটিতে মার্কিন সেনার সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজারে পৌঁছেছিল। ২০১১ সালে সেনা প্রত্যাহারের পর ২০১৪ সালে আইএসের উত্থানের প্রেক্ষাপটে মার্কিন বাহিনী আবার ইরাকে ফিরে আসে।
সেনা প্রত্যাহারের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সরঞ্জাম, বিশেষ করে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। ইরবিলে মোতায়েন মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইরান-সংক্রান্ত সংঘাতের সময় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করতে ভূমিকা রেখেছিল।
কুর্দি সামরিক কমান্ডার সিরওয়ান বারজানির মতে, মার্কিন প্রত্যাহারের ফলে ইরাক মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য, রসদ সহায়তা এবং ড্রোন সক্ষমতার মতো আরও কয়েকটি সুবিধা হারাতে পারে। এ নিয়ে ইরাকের আধা-স্বায়ত্তশাসিত কুর্দি অঞ্চলে উদ্বেগ বেশি।
কুর্দিস্তান রিজিওনাল গভর্নমেন্টের (কেআরজি) প্রধানমন্ত্রী মাসরুর বারজানি বলেন, কোনো বিকল্প প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ছাড়াই কুর্দিস্তান অঞ্চলকে অরক্ষিত অবস্থায় রেখে যাওয়ার বিষয়টি উদ্বেগের। গত মাসে তার কার্যালয় লক্ষ্য করে একটি ড্রোন হামলাও হয়েছিল বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
ইরাকি সরকার বলছে, সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই নিরাপত্তা সংক্রান্ত অনেক দায়িত্ব নিজেদের বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। ইরাকি বিমান বাহিনীর কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল খালিদ আল-তামিমি জানিয়েছেন, ২০২৬ সালের শুরু থেকেই ইরাকের অভ্যন্তরে জোট বাহিনী কোনো দায়িত্ব পালন করছে না।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, নজরদারির ক্ষেত্রে জোট বাহিনীর বিমানের জায়গা নিয়েছে ইরাকি ড্রোন। ইরাকি বিমান বাহিনী প্রতিদিন দেশের আকাশসীমায় পর্যবেক্ষণমূলক ফ্লাইট পরিচালনা করছে। একই সঙ্গে ইরাকের এফ-১৬ যুদ্ধবিমান বহরও বাইরের সহায়তা ছাড়াই পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের সক্ষমতা দেখিয়েছে।
তবে আকাশ প্রতিরক্ষা এখনো বড় একটি বিষয়। ইরাক দক্ষিণ কোরিয়া, তুরস্ক ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সংগ্রহের চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বলে দেশটির এক সামরিক মুখপাত্র জানিয়েছেন।
এক দশক আগে ইরাকের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এলাকা আইএসের নিয়ন্ত্রণে ছিল। বর্তমানে সংগঠনটি আগের তুলনায় অনেক দুর্বল। জাতিসংঘের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরাকি বাহিনীর অব্যাহত চাপের মধ্যে আইএস তাদের সবচেয়ে দুর্বল অবস্থায় রয়েছে এবং সংগঠনটির কয়েকশ যোদ্ধা অবশিষ্ট আছে।
তবে আইএসের গোপন সেলগুলো পুরোপুরি নির্মূল হয়নি। ইরাকি নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের সময়কে কাজে লাগিয়ে হামলার পরিকল্পনা করেছিল সংগঠনটি। ইরাকি এক জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তা বলেন, এর মাধ্যমে আইএস নিজেদের হামলার সক্ষমতা সম্পর্কে বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করছে।
ইরাকের কিছু অ-রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠী, বিশেষ করে ইরানের সঙ্গে সম্পৃক্ত মিলিশিয়া ও আধা-সামরিক বাহিনীগুলো মার্কিন সেনা প্রত্যাহারকে নিজেদের বিজয় হিসেবে দেখছে।
ইরান-ঘনিষ্ঠ ‘ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স ইন ইরাক’-এর কমান্ডার আবু মুজতবা আল-ইয়াসিরি এই প্রত্যাহারকে ইরাকি প্রতিরোধ গোষ্ঠী ও ইরাকিদের জন্য ঐতিহাসিক বিজয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রকল্পের পরাজয় হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এটি ওই গোষ্ঠীর বক্তব্য।
তবে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের সঙ্গে এসব গোষ্ঠীর অস্ত্র সমর্পণের বিষয়টি একসঙ্গে বাস্তবায়িত হয়নি। বাগদাদ আগে ৩০ সেপ্টেম্বরকে অস্ত্র সমর্পণের সময়সীমা হিসেবে নির্ধারণ করলেও অনেক গোষ্ঠী তা প্রত্যাখ্যান করে। পরে সময়সীমা ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
মার্কিন সেনারা ঘাঁটি ছেড়ে গেলেও ইরাকের নিরাপত্তা বিষয়ক সহযোগিতা পুরোপুরি শেষ হচ্ছে না। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে দুই দেশ নিরাপত্তা সহযোগিতার নতুন পর্যায়ে যাওয়ার বিষয়ে সম্মত হয়েছিল। এর মধ্যে সমন্বয়কারী কর্মকর্তা নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, সামরিক সহায়তা, অস্ত্র বিক্রি ও অর্থায়নের মতো বিষয় রয়েছে।
এ ছাড়া মার্কিন সরঞ্জামের রক্ষণাবেক্ষণ এবং ইরাকি বাহিনীর সামরিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মানোন্নয়ন নিয়েও সহযোগিতার কথা রয়েছে।
বাগদাদ বিমানবন্দরে অবস্থিত মার্কিন সদর দপ্তরের নিয়ন্ত্রণ ইরাকের হাতে যাওয়ার পর ইরাকি এক সামরিক কর্মকর্তা বলেছেন, এই হস্তান্তরের অর্থ আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা শেষ হয়ে যাওয়া নয়। বরং পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে সম্পর্ক বজায় রেখে ইরাকের সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা নিশ্চিত করাই লক্ষ্য।
ফলে ৩০ সেপ্টেম্বরকে ইরাক ও যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা সম্পর্কের সমাপ্তি হিসেবে না দেখে নতুন পর্যায়ের সূচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এখন বড় প্রশ্ন হলো, ইরাক কীভাবে নিজের নিরাপত্তার দায়িত্ব আরও বেশি নিজের হাতে নেবে এবং ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের নিরাপত্তা সম্পর্ক কোন পথে এগোবে।
