নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা জোরদার করতে দিল্লিতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নারী পুলিশ সদস্যদের নিয়ে বিশেষ ‘পিংক ফোর্স’ গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রাজধানীর স্কুল, কলেজ, মেট্রো স্টেশন, বাজারসহ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় টহল দেওয়ার পাশাপাশি সংবেদনশীল সময়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব থাকবে এই ইউনিটের।
সম্প্রতি প্রায় ১০ দিনের ব্যবধানে দিল্লিতে নাবালিকাদের ওপর ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের চারটি ঘটনা সামনে আসার পর এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার (৩০ সেপ্টেম্বর) দিল্লির লেফটেন্যান্ট গভর্নর তারানজিত সিং সাধু দিল্লি পুলিশকে গোয়া পুলিশের ‘পিংক ফোর্স’-এর আদলে নতুন ইউনিট গঠনের নির্দেশ দেন।
নতুন বাহিনীর আওতায় রাজধানীর বিভিন্ন ‘হটস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত এলাকায় বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ সময়ে নারী পুলিশ সদস্যদের মোতায়েন করা হবে। স্কুল, কলেজ, মেট্রো স্টেশন ও অন্যান্য সংবেদনশীল স্থানে নিয়মিত টহলের পাশাপাশি যেকোনো পরিস্থিতিতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়াই হবে এই ইউনিটের অন্যতম লক্ষ্য।
গোয়ায় ‘পিংক ফোর্স’ নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা এবং তাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের ঘটনায় দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য কাজ করে। দিল্লির নতুন ইউনিট গঠনে এই বাহিনীকেই মডেল হিসেবে নেওয়া হচ্ছে।
তবে দিল্লি পুলিশের জন্য নারী সদস্যদের দিয়ে টহল পরিচালনা নতুন নয়। এর আগে স্কুল, কলেজ, বাজার, মেট্রো স্টেশন ও জনবহুল এলাকায় নারী কর্মকর্তাদের স্কুটি ও বিট পেট্রোলিংয়ে মোতায়েন করা হয়েছে। নতুন উদ্যোগের মাধ্যমে এসব কার্যক্রমকে একটি নির্দিষ্ট ‘পিংক ফোর্স’ কাঠামোর আওতায় আনার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
এদিকে ‘অপারেশন শিষ্টাচার’-এর আওতায় প্রকাশ্য স্থানে নারীদের উত্ত্যক্ত করার বিরুদ্ধে আইনি অভিযান চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বাজার ও গণপরিবহন কেন্দ্রগুলোতে এই কার্যক্রমের আওতায় ইতোমধ্যে টহল জোরদার করা হয়েছে। প্রস্তাবিত ‘পিংক ফোর্স’ এসব উদ্যোগের পাশাপাশি কাজ করবে।
সর্বশেষ ঘটনায় কালকাজি মন্দিরের কাছে আস্থা কুঞ্জ পার্কে ১৭ বছর বয়সী এক কিশোরীকে তিন ব্যক্তি দলবদ্ধভাবে ধর্ষণ করেছে বলে অভিযোগ ওঠে। পুলিশের দাবি, অভিযুক্তরা নিজেদের পুলিশ পরিচয় দিয়ে ওই কিশোরীকে তার পুরুষ বন্ধুর কাছ থেকে আলাদা করে।
পরে পুলিশের সঙ্গে গোলাগুলির সময় পায়ে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় এক অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ।
গত ১৬ সেপ্টেম্বর সদর বাজারে স্টেশনারি কিনতে গিয়ে একটি দোকানের ভেতর এক নাবালিকা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
এ ছাড়া মধ্য দিল্লির কিষাণগঞ্জে ছয় বছর বয়সী এক শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হয় বলে অভিযোগ ওঠে। পুলিশ জানায়, স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযুক্তকে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেন।
সেপ্টেম্বরের শুরুতে স্বরূপ নগরে ১৬ বছর বয়সী এক কিশোরীকে দলবদ্ধভাবে ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় ১৯ বছর বয়সী এক তরুণকে গ্রেপ্তার এবং তিন নাবালককে আটক করা হয়েছে।
‘পিংক ফোর্স’ গঠনের পাশাপাশি দিল্লি পুলিশের ‘জন শুনানি’ কর্মসূচিতে পাওয়া অভিযোগগুলো ডিজিটাল পদ্ধতিতে ট্র্যাক করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি অভিযোগের প্রাপ্তিস্বীকার দেওয়া হবে এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। অন্য সরকারি দপ্তরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অভিযোগ সংশ্লিষ্ট সংস্থার কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হবে।
গত জুন থেকে বিভিন্ন থানায় ‘জন শুনানি’ কর্মসূচি চলছে। চলতি মাসে পুলিশ জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত ১ হাজার ৩০০টির বেশি সেশন হয়েছে এবং প্রায় ১০ হাজার অভিযোগের সমাধান করা হয়েছে। তবে নতুন ডিজিটাল ব্যবস্থায় অভিযোগ নিষ্পত্তির নির্দিষ্ট সময়সীমা এখনো নির্ধারণ করা হয়নি।
অপরাধপ্রবণ ও জনবহুল এলাকায়, বিশেষ করে স্কুল, কলেজ, বাজার ও পরিবহনকেন্দ্রের আশপাশে পায়ে হেঁটে এবং মোটরসাইকেলে টহল বাড়ানোর নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি পুলিশ ডিস্ট্রিক্টে একজন নোডাল অফিসার নিয়োগের কথাও বলা হয়েছে।
এ ছাড়া স্কুলগুলোতে শিশু সুরক্ষা, পিওসিএসও আইন, সাইবার অপরাধ, মাদকের অপব্যবহার ও সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ত্রৈমাসিক ক্যালেন্ডার তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অন্যান্য নির্দেশনার মধ্যে রয়েছে মাদক চোরাচালান প্রতিরোধ, সাইবার অপরাধ দমন ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা জোরদার করা। পিক আওয়ারে যানজটপ্রবণ এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন এবং সিসিটিভি নজরদারি বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছে।
পুলিশ সদস্যদের কল্যাণের বিষয়টিও নির্দেশনায় গুরুত্ব পেয়েছে। বিশেষ করে নিম্নপদস্থ ও নারী পুলিশ সদস্যদের সময়মতো পদোন্নতির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পুলিশ সদর দপ্তরে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অভিযোগ ও ক্ষোভ শোনার ব্যবস্থা করার কথাও বলা হয়েছে।
এ ছাড়া পুলিশ আবাসন কলোনিগুলোকে ‘জিরো-ওয়েস্ট’ বা বর্জ্যহীন মডেলে রূপান্তরের দিকেও এগিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
