ইরানের যুদ্ধবিরতি ও হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে একই সঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রও একটি চুক্তি করতে আগ্রহী। তাঁর মতে, তেহরানের বর্তমান প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য নয়।
ইরানের প্রস্তাব ছিল সাত দিনের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধ করা এবং হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া। এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর নৌ অবরোধ তুলে নিতে, তেল বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করতে এবং আটকে থাকা প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি ডলারের ইরানি সম্পদ ছাড়তে বলা হয়। লেবানন ও ইয়েমেনসহ পুরো অঞ্চলে বিস্তৃত যুদ্ধবিরতির কথাও প্রস্তাবে ছিল।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে পাঠানো প্রস্তাবের বিষয়ে ট্রাম্পের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া তাঁরা দেখেছেন। তবে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো জবাব পাওয়া যায়নি বলে জানান তিনি।
আল-জাজিরার বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ট্রাম্প হয়তো মনে করছেন, ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাপ এখনো সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়নি। এরই মধ্যে তেহরানের ওপর নৌ অবরোধ আরও কঠোর করা হয়েছে এবং ইরানের তেল থেকে আয় কমানোর লক্ষ্যে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করা দেশগুলোর ওপরও মাধ্যমিক নিষেধাজ্ঞার হুমকি রয়েছে।
গত সপ্তাহে ইরানের ওপর উড়োজাহাজ চলাচলসংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞাও আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এর ফলে দেশটির বিমান চলাচলে প্রভাব পড়ছে। এর আগে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ইরানের আর্থিক স্বার্থকে লক্ষ্য করে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক চাপ তৈরির একটি অভিযান শুরুর কথা জানিয়েছিলেন।
ন্যাটো ডিফেন্স কলেজের জ্যেষ্ঠ অনাবাসিক সহযোগী ফেলো রিচার্ড ওয়েইটজের মতে, ওয়াশিংটন হয়তো মনে করছে, আরও কিছুটা অপেক্ষা করলে ইরানের কাছ থেকে আরও অনুকূল শর্ত পাওয়া যেতে পারে। সময়ের সঙ্গে অর্থনৈতিক চাপ বাড়লে তেহরান আরও ছাড় দিতে পারে—এমন হিসাবও ওয়াশিংটনের থাকতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তবে বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, অপেক্ষার কৌশলের ঝুঁকিও রয়েছে। সময় গড়ানোর সঙ্গে শুধু ইরানের ওপর চাপ বাড়বে না; জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, সামরিক বাহিনীর ওপর ঝুঁকি এবং উপসাগরীয় মিত্রদের ওপর চাপও বাড়তে পারে।
হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল কার্যত বন্ধ থাকায় উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল ও গ্যাস রপ্তানি ব্যাহত হচ্ছে। এসব দেশের অর্থনীতি জ্বালানি রপ্তানির ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের অধ্যাপক মোহামাদ এলমাসরি মনে করেন, ইরানের প্রস্তাবের মাধ্যমে যুদ্ধের আগে জ্বালানি ও গ্যাসের দাম কমানোর একটি সম্ভাব্য পথও তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে, ইরান চাইলে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে নিজেদের ওপর বাড়তে থাকা অর্থনৈতিক চাপের জন্য ট্রাম্পকে রাজনৈতিকভাবে মূল্য দিতে বাধ্য করার কৌশল নিতে পারে—এমন সম্ভাবনার কথাও বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
সংঘাত দীর্ঘ হলে হরমুজ প্রণালি, আঞ্চলিক অবকাঠামো এবং বাব আল-মানদেব প্রণালির মাধ্যমে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহে আরও বিঘ্ন ঘটতে পারে। এতে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে চাপ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আল-জাজিরার সঙ্গে কথা বলা বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালিতে অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হলে কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর চাপ বাড়তে পারে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিশ্লেষক হ্যারিসনের মতে, ট্রাম্প ইরানের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেও তেহরান এতে খুব বেশি বিস্মিত নাও হয়ে থাকতে পারে। তাঁর মতে, প্রস্তাব দেওয়ার একটি উদ্দেশ্য হতে পারে—ইরান এখনো আলোচনায় আগ্রহী, সেটি ইরানি ও মার্কিন জনগণের কাছে তুলে ধরা।
অন্যদিকে বিশেষজ্ঞদের একটি বিশ্লেষণ হলো, তেহরানও সময়কে কাজে লাগাতে চাইছে। তাদের ধারণা, সময় যত গড়াবে, সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসার খরচ তত বাড়তে পারে এবং শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রকে আবার আলোচনার টেবিলে ফিরতে হতে পারে।
হ্যারিসনের ভাষ্য অনুযায়ী, দুই পক্ষেরই একটি চুক্তির প্রয়োজন রয়েছে। তবে বর্তমানে উভয় পক্ষই মনে করছে, অপেক্ষা করলে ভবিষ্যতের চুক্তিতে নিজেদের জন্য আরও অনুকূল শর্ত আদায় করা সম্ভব হতে পারে।
