এশিয়া মহাদেশে ৪৮টি দেশ রয়েছে—জাতিসংঘের পরিসংখ্যান বিভাগের UN M49 ভৌগোলিক শ্রেণিবিন্যাস অনুসরণ করলে এ সংখ্যাই পাওয়া যায়। জাতিসংঘ এশিয়াকে পাঁচটি উপঅঞ্চলে ভাগ করেছে—মধ্য এশিয়া, পূর্ব এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, দক্ষিণ এশিয়া এবং পশ্চিম এশিয়া। এই পাঁচ অঞ্চলের দেশগুলোর সংখ্যা যথাক্রমে ৫, ৫, ১১, ৯ ও ১৮; সব মিলিয়ে ৪৮টি।
তবে এশিয়ার দেশসংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন উৎসে ভিন্ন সংখ্যা দেখা যায়। এর প্রধান কারণ হলো, কোন ভৌগোলিক শ্রেণিবিন্যাস অনুসরণ করা হচ্ছে এবং আন্তঃমহাদেশীয় রাষ্ট্র বা বিশেষ রাজনৈতিক অবস্থানসম্পন্ন ভূখণ্ডকে কীভাবে গণনা করা হচ্ছে, তার ওপর তালিকায় পার্থক্য তৈরি হতে পারে। তাই শুধু সংখ্যা উল্লেখ করার পরিবর্তে কোন সংস্থার কোন শ্রেণিবিন্যাস অনুসরণ করা হচ্ছে, সেটি উল্লেখ করা গুরুত্বপূর্ণ।
জাতিসংঘের M49 হলো একটি পরিসংখ্যানগত ভৌগোলিক শ্রেণিবিন্যাস ব্যবস্থা। এটি দেশ ও অঞ্চলকে পরিসংখ্যানগত উদ্দেশ্যে বিভিন্ন ভৌগোলিক অঞ্চলে ভাগ করে। এই শ্রেণিবিন্যাস কোনো ভূখণ্ডের রাজনৈতিক বা আইনগত মর্যাদা সম্পর্কে জাতিসংঘের মতামত হিসেবে বিবেচিত নয়।
অঞ্চলভিত্তিক এশিয়ার দেশ
জাতিসংঘের M49 অনুযায়ী এশিয়ার দেশগুলো পাঁচটি প্রধান উপঅঞ্চলে বিভক্ত।
মধ্য এশিয়া — ৫টি দেশ:
কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান, তাজিকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান ও উজবেকিস্তান।
পূর্ব এশিয়া — ৫টি দেশ:
চীন, জাপান, মঙ্গোলিয়া, উত্তর কোরিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়া।
পূর্ব এশিয়ার M49 তালিকায় হংকং ও ম্যাকাওকেও পৃথক ‘country or area’ হিসেবে দেখানো হয়েছে। তবে এগুলো চীনের বিশেষ প্রশাসনিক অঞ্চল এবং স্বাধীন রাষ্ট্র নয়। তাই ৪৮টি দেশের হিসাব করার সময় এগুলোকে আলাদা দেশ হিসেবে ধরা হয় না।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া — ১১টি দেশ:
ব্রুনেই, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া, লাওস, মালয়েশিয়া, মিয়ানমার, ফিলিপাইন, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, তিমুর-লেস্তে ও ভিয়েতনাম।
দক্ষিণ এশিয়া — ৯টি দেশ:
আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত, ইরান, মালদ্বীপ, নেপাল, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা।
পশ্চিম এশিয়া — ১৮টি দেশ:
আর্মেনিয়া, আজারবাইজান, বাহরাইন, সাইপ্রাস, জর্জিয়া, ইরাক, ইসরায়েল, জর্ডান, কুয়েত, লেবানন, ওমান, কাতার, সৌদি আরব, ফিলিস্তিন, সিরিয়া, তুরস্ক, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইয়েমেন।
অঞ্চলভিত্তিক এই হিসাব দাঁড়ায়: ৫ + ৫ + ১১ + ৯ + ১৮ = ৪৮টি দেশ।
৪৮টি না ৪৯টি—কেন এমন পার্থক্য দেখা যায়?
এশিয়ার দেশসংখ্যা নিয়ে সবচেয়ে বেশি বিভ্রান্তির একটি কারণ হলো রাশিয়ার অবস্থান। রাশিয়ার বিশাল ভূখণ্ড এশিয়ায় অবস্থিত হলেও জাতিসংঘের M49 শ্রেণিবিন্যাসে রাশিয়াকে এশিয়ার পরিবর্তে ইউরোপের পূর্ব ইউরোপীয় উপঅঞ্চলে রাখা হয়েছে। ফলে জাতিসংঘের M49-ভিত্তিক ৪৮ দেশের তালিকায় রাশিয়া নেই।
অন্যদিকে সাধারণ ভৌগোলিক আলোচনায় রাশিয়াকে প্রায়ই ইউরোপ ও এশিয়া—দুই মহাদেশে বিস্তৃত একটি আন্তঃমহাদেশীয় দেশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। সেই ধরনের শ্রেণিবিন্যাস ব্যবহার করলে এশিয়ার দেশসংখ্যা নিয়ে ৪৮-এর চেয়ে ভিন্ন হিসাব পাওয়া সম্ভব।
তুরস্ক ও কাজাখস্তানের ক্ষেত্রেও আন্তঃমহাদেশীয় অবস্থানের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। দুটি দেশেরই ভূখণ্ড ইউরোপ ও এশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে জাতিসংঘের M49 শ্রেণিবিন্যাসে কাজাখস্তানকে মধ্য এশিয়া এবং তুরস্ককে পশ্চিম এশিয়া অঞ্চলে রাখা হয়েছে।
সাইপ্রাসের ক্ষেত্রেও ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক শ্রেণিবিন্যাসের মধ্যে পার্থক্য দেখা যায়। জাতিসংঘের M49 অনুযায়ী সাইপ্রাস পশ্চিম এশিয়ার অন্তর্ভুক্ত।
ফিলিস্তিন ও তাইওয়ানের ক্ষেত্রে কীভাবে গণনা করা হয়?
এশিয়ার দেশসংখ্যা নিয়ে আলোচনায় ফিলিস্তিন ও তাইওয়ানের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। জাতিসংঘের M49 শ্রেণিবিন্যাসে State of Palestine পশ্চিম এশিয়ার অন্তর্ভুক্ত। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ২০১২ সালে ফিলিস্তিনকে non-member observer State মর্যাদা দেয়।
অন্যদিকে জাতিসংঘের M49 এশিয়া অঞ্চলের তালিকায় তাইওয়ানকে পৃথক দেশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ফলে ৪৮ দেশের জাতিসংঘভিত্তিক হিসাবের সঙ্গে তাইওয়ানকে আলাদাভাবে যোগ করা হয় না।
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। জাতিসংঘের M49 কোনো দেশের সার্বভৌমত্ব বা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়ার ব্যবস্থা নয়। এটি মূলত পরিসংখ্যানগত ও ভৌগোলিক শ্রেণিবিন্যাসের জন্য ব্যবহৃত হয়। তাই কোনো দেশের তালিকা বা সংখ্যা দেখার সময় সংশ্লিষ্ট উৎসের শ্রেণিবিন্যাসের ভিত্তি বিবেচনা করা জরুরি।
এশিয়া মহাদেশের গুরুত্ব
এশিয়া শুধু আয়তনের দিক থেকে বিশ্বের বৃহত্তম মহাদেশ নয়; জনসংখ্যা, অর্থনীতি, ইতিহাস ও সংস্কৃতির দিক থেকেও এটি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। চীন, ভারত, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ইন্দোনেশিয়া, সৌদি আরব, তুরস্কসহ বহু গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র এই মহাদেশে অবস্থিত।
প্রাচীন সভ্যতার বিকাশের ক্ষেত্রেও এশিয়ার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। মেসোপটেমিয়া, সিন্ধু উপত্যকা ও প্রাচীন চীনা সভ্যতার মতো ঐতিহাসিক সভ্যতাগুলো এ মহাদেশের সঙ্গে সম্পর্কিত। একই সঙ্গে সিল্ক রোডসহ প্রাচীন বাণিজ্যপথ এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলকে ইউরোপ ও অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত করেছিল।
বর্তমান বিশ্বেও এশিয়া আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, শিল্প, প্রযুক্তি, জ্বালানি, বিনিয়োগ ও ভূরাজনীতির অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। ফলে এশিয়ার দেশগুলোর ভৌগোলিক অবস্থান ও আঞ্চলিক শ্রেণিবিন্যাস শুধু সাধারণ জ্ঞানেই নয়, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও বৈশ্বিক অর্থনীতির ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।
তাহলে এশিয়া মহাদেশে মোট কতটি দেশ?
জাতিসংঘের UN M49 ভৌগোলিক শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী এশিয়ায় ৪৮টি দেশ রয়েছে। এই হিসাবের মধ্যে মধ্য এশিয়ায় ৫টি, পূর্ব এশিয়ায় ৫টি, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ১১টি, দক্ষিণ এশিয়ায় ৯টি এবং পশ্চিম এশিয়ায় ১৮টি দেশ রয়েছে।
তবে অন্য কোনো উৎসে ৪৯টি বা ভিন্ন সংখ্যা দেখা গেলে সেটি কেন আলাদা, তা বুঝতে সংশ্লিষ্ট উৎসের ভৌগোলিক সংজ্ঞা পরীক্ষা করতে হবে। বিশেষ করে রাশিয়ার মতো আন্তঃমহাদেশীয় রাষ্ট্র এবং ফিলিস্তিন, তাইওয়ান, হংকং ও ম্যাকাওয়ের মতো ভিন্ন রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক অবস্থানের ক্ষেত্রে শ্রেণিবিন্যাসের পার্থক্য সংখ্যাকে প্রভাবিত করতে পারে।
সুতরাং, “এশিয়া মহাদেশের দেশ কয়টি?”—জাতিসংঘের M49 ভিত্তিক উত্তরে এশিয়ায় ৪৮টি দেশ রয়েছে। তবে দেশসংখ্যা উল্লেখ করার সময় কোন শ্রেণিবিন্যাস অনুসরণ করা হয়েছে, তা স্পষ্ট করাই সবচেয়ে নির্ভুল পদ্ধতি।
সূত্র
- United Nations Statistics Division — Standard country or area codes for statistical use (M49)
- United Nations Statistics Division — M49 Geographic Regions
- United Nations — Non-Member States
- United Nations — State of Palestine and its status at the United Nations
