মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার বরমচাল ইউনিয়নে বন বিভাগের সঙ্গে দীর্ঘদিনের বিরোধপূর্ণ ১৫০ একর জমির দখল স্থানীয় ইছলাছড়া পুঞ্জির (খাসিয়া ও গারো সম্প্রদায়) লোকজনের কাছে হস্তান্তরকে কেন্দ্র করে নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। আদালতের স্থিতাবস্থা বজায় রাখার নির্দেশ কার্যকর থাকা অবস্থায় স্থানীয় সংসদ সদস্যের মধ্যস্থতায় এই সমঝোতা হওয়ায় প্রশ্ন তুলেছে বন বিভাগ।
বন বিভাগ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বরমচাল ভাটেরা হিল রিজার্ভ ফরেস্টের আওতাধীন প্রায় ১৫০ একর জমির মালিকানা নিয়ে বহু বছর ধরে বন বিভাগ এবং ইছলাছড়া পুঞ্জির বাসিন্দাদের মধ্যে বিরোধ চলে আসছে। যদিও প্রায় এক দশকেরও বেশি সময় ধরে স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি ওই জমি দখলে রেখে সেখানে বাণিজ্যিকভাবে গাছের বাগান গড়ে তোলেন।
এই বিরোধের জেরে উভয় পক্ষ আদালতে একাধিক মামলা করে। এর মধ্যে ২০২২ সালে খাসিয়া সম্প্রদায়ের করা একটি মামলায় আদালত জমির বর্তমান অবস্থা বা স্থিতাবস্থা বজায় রাখার নির্দেশ দেন। আদালতের এ নির্দেশ সত্ত্বেও সম্প্রতি জমির দখল পরিবর্তন হওয়ায় নতুন করে বিতর্ক দেখা দিয়েছে।
সিলেট বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. আবদুর রহমান বলেন, বিরোধপূর্ণ জমি দখলের প্রচেষ্টার বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে এবং এ বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আদালতের স্থিতাবস্থার নির্দেশ বহাল থাকার পরও কীভাবে এ ধরনের সমঝোতা হয়েছে, সেটিও তদন্তের দাবি রাখে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বন বিভাগ জানায়, ২০২২ সালে দখলদাররা প্রায় ১৬ লাখ টাকায় বাগানের সব গাছ স্থানীয় টিপু চৌধুরী নামে এক ব্যক্তির কাছে বিক্রি করেন। পরে তিনি প্রায় ৫০০টি গাছ কাটেন। খবর পেয়ে বন বিভাগের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে গাছ কাটা বন্ধের চেষ্টা করেন। এ ঘটনায় টিপু চৌধুরীর বিরুদ্ধে একাধিক মামলাও দায়ের করা হয়।
বন বিভাগের তথ্যমতে, ১৯২৪ সালে ঘোষিত বরমচাল ভাটেরা হিল রিজার্ভ ফরেস্টের মোট আয়তন ১ হাজার ১৯৭ দশমিক ৬০ একর। এই সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ভেতরেই অবস্থিত ইছলাছড়া পুঞ্জি, যেখানে খাসিয়া ও গারো সম্প্রদায়ের প্রায় ৬০ থেকে ৭০টি পরিবার বসবাস করে। পান চাষ ও বিক্রি তাদের প্রধান জীবিকা।
স্থানীয় একটি সূত্র জানায়, সম্প্রতি পুঞ্জির বাসিন্দারা জমি পুনরুদ্ধারের জন্য মৌলভীবাজার-২ (কুলাউড়া) আসনের সংসদ সদস্য শওকতুল ইসলামের শরণাপন্ন হন। পরে তাঁর উদ্যোগে স্থানীয় বিএনপির নেতাদের মাধ্যমে দুই পক্ষের মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে বাগানমালিকদের ক্ষতিপূরণ হিসেবে ১৯ লাখ টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। অর্থ পরিশোধের পর তারা জমির দখল ছেড়ে দেন।
সমঝোতার বিষয়টি নিশ্চিত করে সংসদ সদস্য শওকতুল ইসলাম ২৯ জুলাই মুঠোফোনে বলেন, একটি সমাধানে পৌঁছানো হয়েছে। তবে আদালতের স্থিতাবস্থা বহাল থাকা অবস্থায় কীভাবে এই মধ্যস্থতা করা হয়েছে—এ প্রশ্নের জবাব তিনি দেননি। বিস্তারিত জানতে তিনি স্থানীয় বিএনপি নেতা আবদুল লতিফ ও আবদুল মোক্তাদীরের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন।
বরমচাল ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি আবদুল লতিফ এবং সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবদুল মোক্তাদীর জানান, সংসদ সদস্যের উদ্যোগেই বাগানমালিক ও ইছলাছড়া পুঞ্জির বাসিন্দাদের মধ্যে সমঝোতা হয়েছে। তবে অর্থ লেনদেনের বিষয়ে তাঁদের কোনো তথ্য নেই।
এদিকে, উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত ২৫ জুলাই পুঞ্জির চার বাসিন্দা বিরোধপূর্ণ জমিতে প্রবেশ করে ঝোপঝাড় পরিষ্কার করে সুপারি গাছের চারা রোপণ করেন। এ সময় বন বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাঁদের বাগ্বিতণ্ডাও হয়। পরে বন বিভাগের এক কর্মকর্তা চারজনের বিরুদ্ধে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। ২৭ জুলাই উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) প্রণয় বিশ্বাস ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।
ইছলাছড়া পুঞ্জির বাসিন্দা জন ছেল্লা বলেন, “এই জমি আমাদের। এমপি সাহেব সমাধান করে দিয়েছেন। কীভাবে করেছেন, উনিই জানেন। আমরা জমির দখল ছাড়ব না।”
কুলাউড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শেখ জহিরুল ইসলাম জানান, বিরোধপূর্ণ জমি ঘিরে যাতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি না ঘটে, সে বিষয়ে পুলিশ সতর্ক রয়েছে। আদালতের স্থিতাবস্থা বহাল থাকায় উভয় পক্ষকে আদালতের নির্দেশনা মেনে চলার জন্য বলা হয়েছে।
