জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দেওয়া প্রথম ভাষণ নিয়ে সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও সাধারণ মানুষের কাছ থেকে প্রশংসার কথা জানিয়েছে বাসস। ভাষণে বাংলাদেশ পুনর্গঠন, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং বৈশ্বিক শান্তি ও সহযোগিতায় দেশের ভূমিকা জোরদারের একটি পথরেখা তুলে ধরা হয়।
জাতীয় অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, দীর্ঘ সময়ের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শোষণে বাংলাদেশের অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়েছিল। এমন পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে দেশ পুনর্গঠন ও পুনরুদ্ধারের কাঠামো হিসেবে সরকারের ‘থ্রি-আর’—রিকভারি, রেস্টোরেশন ও রিকনস্ট্রাকশন—কৌশল তুলে ধরেছেন।
মাহবুব উল্লাহর মতে, এই কৌশল বাস্তবায়নে ব্যাপক অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ প্রয়োজন হবে। মূল্যস্ফীতি ও বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের মধ্যে উন্নয়নে অর্থায়নের সক্ষমতা বাড়াতে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত তিন শতাংশীয় পয়েন্ট বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি আরও বলেন, দেশের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের বোঝা বেড়েছে। ভবিষ্যতে ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধ উন্নয়নের ক্ষেত্রে বড় বাধা হতে পারে। তবে উৎপাদনশীল কাজে ঋণের অর্থ ব্যবহার করা হলে তা সমস্যা নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ব্যাংকিং খাতের সংস্কার অর্থনীতি পুনরুজ্জীবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে উল্লেখ করেছেন বলেও জানান মাহবুব উল্লাহ। একই সঙ্গে তিনি বলেন, অর্থনৈতিক সংকট মোকাবেলায় প্রধানমন্ত্রী ধনী দেশগুলোর সহায়তাকে প্রধান উপায় হিসেবে না দেখিয়ে দেশের নিজস্ব প্রতিশ্রুতি ও দায়িত্বশীলতার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
ভাষণে রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। মাহবুব উল্লাহ বলেন, বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের দীর্ঘস্থায়ী অবস্থান দেশের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে এবং প্রত্যাবাসন নিয়ে দীর্ঘদিনেও সমাধান না হওয়ায় নিরাপত্তার ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. মো. নুরুল আমিন বেপারী বলেন, রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশ সৃষ্টি করেনি। তাই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় মিয়ানমারকেই মূল ভূমিকা পালন করতে হবে। তাঁর মতে, চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘের সম্পৃক্ততার কারণে রোহিঙ্গা ইস্যুটি এখন আন্তর্জাতিক উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে রোহিঙ্গা ইস্যু স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে জনগণের ক্ষমতায়নের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তাঁর মতে, ‘থ্রি-আর’ কৌশল এবং যুদ্ধবিগ্রহের বিরোধিতার মাধ্যমে শান্তি ও পুনর্গঠনের প্রতি বাংলাদেশের অঙ্গীকার তুলে ধরা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক সংঘাতের শান্তিপূর্ণ সমাধানে সামরিক সংঘাতের পরিবর্তে সংলাপ, কূটনীতি ও পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
‘প্রতিদিনের বাংলাদেশ’ পত্রিকার সম্পাদক মারুফ কামাল খান ভাষণটিকে বিশ্বশান্তির জন্য বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি প্রধানমন্ত্রীর ‘ঘাতক অস্ত্র নয়, পৃথিবী বদলাবে মানবতায়’ বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলেন, ভাষণে শান্তির বার্তা উঠে এসেছে।
মারুফ কামাল খান জানান, প্রধানমন্ত্রী স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের প্রতি বাংলাদেশের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন এবং ফিলিস্তিন সংকটের স্থায়ী সমাধানের আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ, জলবায়ু পরিবর্তন, নারী শিক্ষা ও ক্ষমতায়ন, শিশু স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দায়িত্বশীল ব্যবহারের বিষয়গুলোও ভাষণে গুরুত্ব পেয়েছে।
প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ আবদাল আহমদ বলেন, বাংলায় দেওয়া ১৭ মিনিটের ভাষণে বিশ্বশান্তি, আন্তর্জাতিক দ্বন্দ্বের শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং শক্তিশালী বহুপক্ষীয় সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরা হয়েছে। রোহিঙ্গা সংকট, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, পরিবেশগত সমস্যা এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র সংস্কারের মতো বাংলাদেশের বিভিন্ন উদ্বেগের বিষয়ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে তুলে ধরা হয়েছে বলে জানান তিনি।
আবদাল আহমদ আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী জুলাই আন্দোলন ও গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্র ও আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। পাশাপাশি রাষ্ট্র পুনর্গঠনের দীর্ঘমেয়াদি রোডম্যাপ হিসেবে ‘থ্রি-আর’ কৌশল তুলে ধরেছেন।
বাসসের প্রতিবেদনে উঠে আসা জনমতের অংশ হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তামজিদ বলেন, ভাষণটি তাঁর প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটিয়েছে। রাজধানীর নীলক্ষেতের দোকানি মোহাম্মদ শাহীন বলেন, সাধারণ বাংলাদেশিদের উদ্বেগের বিষয়গুলো আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুলে ধরার বিষয়টি তাঁর ভালো লেগেছে। পথচারী মোহাম্মদ জসিমও বাংলাদেশের মর্যাদা, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও রোহিঙ্গা সংকটের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা উল্লেখ করেন।
ভাষণে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির প্রতিশ্রুতির কথাও উঠে এসেছে। পাশাপাশি জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সংলাপের পথ খোলা রাখার কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যেকোনো সমস্যার সমাধান সংলাপ, কূটনৈতিক প্রক্রিয়া ও পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমেই হওয়া উচিত।
