‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতিতে চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক এগোবে; জ্বালানি ও শ্রমবাজারে বহুমুখীকরণের উদ্যোগ
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণে জাতীয় স্বার্থ ও জনগণের কল্যাণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। তিনি বলেছেন, বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের কৌশলগত সম্পর্ক কতটা গভীর হবে, তা নির্ভর করবে দেশের জনগণ ও অর্থনীতি কতটা উপকৃত হচ্ছে তার ওপর। পারস্পরিক সুবিধা ও জাতীয় স্বার্থকে কেন্দ্র করেই ভবিষ্যতের কূটনৈতিক সম্পর্ক পরিচালিত হবে।
শনিবার (৪ জুলাই) রাজধানীর কারওয়ান বাজারে অনুষ্ঠিত ‘পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি’ শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ রিসার্চ অ্যানালাইসিস অ্যান্ড ইনফরমেশন নেটওয়ার্ক (ব্রেন) এ আলোচনার আয়োজন করে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি এখন এমন এক কাঠামোর দিকে এগোচ্ছে, যেখানে কোনো দেশের প্রতি অন্ধ সমর্থন বা বিরোধিতার পরিবর্তে বাস্তবভিত্তিক ও ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি অনুসরণ করা হবে। তিনি জানান, চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়াসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের লাভ-ক্ষতি এবং জনগণের স্বার্থকে প্রধান বিবেচনায় রাখা হচ্ছে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমান সরকার ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির আওতায় আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পরিচালনা করছে, যার লক্ষ্য দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক অংশীদারিত্ব সম্প্রসারণ।
শামা ওবায়েদ ইসলাম জানান, প্রচলিত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কূটনীতির পাশাপাশি সংস্কৃতি, খেলাধুলা এবং সৃজনশীল অর্থনীতিকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এ লক্ষ্যে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ‘স্পোর্টস অ্যান্ড কালচার’, ‘মাইগ্রেশন’ এবং ‘ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স’ নামে নতুন তিনটি বিশেষায়িত ইউনিট চালু করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বব্যাপী সফট পাওয়ারের গুরুত্ব বাড়ার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের এই উদ্যোগ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি গঠনে সহায়ক হতে পারে।
গোলটেবিলে প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং সরবরাহব্যবস্থার ঝুঁকি বিবেচনায় সরকার এখন একক উৎসনির্ভরতা কমানোর দিকে গুরুত্ব দিচ্ছে। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে নতুন নতুন বাজার অনুসন্ধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, শ্রমবাজার ও জ্বালানি উৎস বৈচিত্র্যময় করা গেলে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে এবং বৈশ্বিক সংকটের প্রভাব তুলনামূলকভাবে কমবে।
প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে বিদ্যমান বিভিন্ন ইস্যু আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পক্ষে বাংলাদেশের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন শামা ওবায়েদ। তিনি বলেন, সীমান্তে প্রাণহানি, বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা এবং আন্তঃসীমান্ত নদীর পানি বণ্টনের মতো বিষয়গুলোতে গঠনমূলক কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রাখা প্রয়োজন।
তার মতে, পারস্পরিক আস্থা ও নিয়মিত সংলাপ দুই দেশের সম্পর্ককে আরও কার্যকর ও স্থিতিশীল করতে পারে।
আলোচনায় প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, পরিবর্তিত আন্তর্জাতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশ বহুপক্ষীয় সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। তিনি জানান, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বিভিন্ন অর্থনৈতিক ও কৌশলগত জোটে সম্পৃক্ত হওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ আগ্রহী এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও কার্যকর করার প্রয়োজন রয়েছে।
গোলটেবিল আলোচনায় সংসদ সদস্য মীর আহমাদ বিন কাসেম (আরমান), সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহবুবুজ্জামান, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাসান আরিফ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক আমেনা মহসিন, অধ্যাপক মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান, সহযোগী অধ্যাপক ওবায়দুল হক এবং ব্রেনের নির্বাহী পরিচালক সফিকুর রহমানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞরা অংশ নেন।
বিশ্ব রাজনীতির দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ একটি বাস্তববাদী ও স্বার্থনির্ভর পররাষ্ট্রনীতির দিকে এগোচ্ছে বলে আলোচনায় উঠে এসেছে। জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক সুযোগ, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং বহুপক্ষীয় সহযোগিতাকে কেন্দ্র করে ভবিষ্যতের কূটনৈতিক কৌশল নির্ধারণের ইঙ্গিত দিয়েছে সরকারের সর্বশেষ অবস্থান।
