তৃণমূল নেতাকর্মীদের সক্রিয় রাখা, পলাতক নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ ও ঝটিকা মিছিল নিয়ে নজরদারি
কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ডিসেম্বরকে সামনে রেখে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সক্রিয় রাখার চেষ্টা করছে বলে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। দলীয় নেতাকর্মীদের সংঘবদ্ধ করা, বিদেশে অবস্থানরত শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো এবং বিভিন্ন এলাকায় ঝটিকা মিছিলের মাধ্যমে সাংগঠনিক উপস্থিতি জানান দেওয়ার চেষ্টা চলছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের বরাত দিয়ে যুগান্তর জানিয়েছে, এ বিষয়ে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে একটি প্রতিবেদন তৈরি করে সরকারের উচ্চপর্যায়ে অবহিত করা হয়েছে।
সূত্রের দাবি, সরকার পতনের পর আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা থেকে তৃণমূলের কর্মীরা আত্মগোপনে গেলেও তাদের পারস্পরিক যোগাযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়নি। আধুনিক প্রযুক্তি ও এনক্রিপ্টেড অ্যাপের মাধ্যমে দেশে থাকা নেতাকর্মীদের সঙ্গে বিদেশে অবস্থানরত নেতাদের যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।
গোপালগঞ্জ, শরীয়তপুর, মাদারীপুর, ফরিদপুর, গাজীপুর, নরসিংদী ও নারায়ণগঞ্জ জেলার নেতাকর্মীরা পলাতক শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে তুলনামূলক বেশি যোগাযোগ রাখছেন বলে গোয়েন্দা সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
বিদেশে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের কয়েকজন সাবেক শীর্ষ নেতা ও দলীয় নেতার সঙ্গে যোগাযোগের কথাও সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিজেদের সাংগঠনিক শক্তির জানান দিতে গত দুই সপ্তাহে ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন এলাকায় আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা কয়েকটি ঝটিকা মিছিল করেছেন। বনানী, ময়মনসিংহ, শরীয়তপুর, সাভার ও সুনামগঞ্জের ঘটনাগুলো নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ময়মনসিংহের গাঙ্গিনাপাড় এলাকায় যুবলীগের নেতাকর্মীদের ঝটিকা মিছিল প্রতিরোধে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে কোতোয়ালি মডেল থানার একটি পুলিশ ফাঁড়ির পুরো ২৭ সদস্যের দল প্রত্যাহার করা হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে, যেকোনো ধরনের নাশকতা ঠেকাতে প্রশাসন ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার কথা বলা হয়েছে।
গোয়েন্দা সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে রাজধানীর কয়েকটি আবাসিক এলাকাকে আত্মগোপনের জন্য ব্যবহার করার অভিযোগও করা হয়েছে। ভাটারা, বনশ্রী, আফতাবনগর, মহানগর আবাসিক, খিলক্ষেত, নিকুঞ্জ, মোহাম্মদপুর, বসিলা, কামরাঙ্গীরচর, শনির আখড়া, যাত্রাবাড়ী ও উত্তরা এলাকার নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়াতে কেউ রাইড শেয়ারিং মোটরসাইকেল বা অটোরিকশা চালাচ্ছেন, কেউ ব্যবসা করছেন বা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরি নিয়েছেন—এমন দাবিও প্রতিবেদনে এসেছে। কয়েকজনের অনলাইন পোর্টাল ও ইউটিউব চ্যানেলের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের পক্ষে প্রচারণা চালানোর অভিযোগের কথাও বলা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন কোনো যাচাইয়ের তথ্য প্রদত্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ নেই।
সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পরিত্যক্ত অবস্থায় ককটেল ও বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি বিস্ফোরক ও বোমা তৈরির সরঞ্জাম জব্দের ঘটনাগুলোকে সম্ভাব্য নাশকতার আশঙ্কার সঙ্গে দেখছেন গোয়েন্দারা বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ বলেছেন, অপরাধচক্রের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং বিশেষ উদ্দেশ্যে কোনো মহল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর চেষ্টা করছে কি না, সে বিষয়ে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের আইনের আওতায় আনা হবে বলেও তিনি জানান।
সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক আব্দুল কাইয়ুম মনে করেন, আওয়ামী লীগের সাবেক নেতাদের একটি অংশ অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হওয়ায় তারা অর্থ ব্যয় করে অরাজক পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করতে পারেন। তবে সাধারণ মানুষের মধ্যে দলটির প্রতি সমর্থন না থাকায় এমন প্রচেষ্টা সফল হওয়ার সম্ভাবনা কম বলে তিনি মন্তব্য করেন।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) নাঈম আশফাক চৌধুরী বলেন, দেশে বিশৃঙ্খলা হলে নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা আগের তুলনায় বেড়েছে এবং জনগণের সহযোগিতায় যেকোনো বিশৃঙ্খলা প্রতিহত করা সম্ভব।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও সমাজ-অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, ডিসেম্বরের মধ্যে আওয়ামী লীগের ফিরে আসার আলোচনা মূলত রাজনৈতিক অস্তিত্ব ধরে রাখা এবং নেতাকর্মীদের মনোবল চাঙা রাখার কৌশল হতে পারে। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর নির্দিষ্ট সময়সীমা ধরে দ্রুত রাজনৈতিকভাবে ফিরে আসা সহজ নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
অন্যদিকে, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে দেশের সব উপজেলায় আহ্বায়ক কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছে। ২৮ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সংশ্লিষ্ট জেলা ইউনিটগুলোকে এ কমিটি গঠনের সময়সীমা দেওয়া হয়েছে।
এনসিপির নির্দেশনায় বলা হয়েছে, পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন সম্ভব না হলে ১১ থেকে ১৫ সদস্যের আংশিক আহ্বায়ক কমিটি করা যাবে। পরে ১৫ দিনের মধ্যে ৫১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি কমিটিতে নারী এবং বিভিন্ন ধর্মীয় ও জাতিগোষ্ঠীর আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
দলটির সাংগঠনিক তৎপরতার এই নির্দেশনা স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মাঠপর্যায়ে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রস্তুতির বিষয়টিকেও সামনে এনেছে।
