নির্দলীয় নির্বাচনের বাস্তবতায় মাঠ জরিপে জোর; ত্যাগী ও জনপ্রিয় নেতাদের অগ্রাধিকার দেওয়ার ইঙ্গিত
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে সাংগঠনিক প্রস্তুতি জোরদার করলেও এখনই কোনো সম্ভাব্য প্রার্থীর নাম আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত করছে না বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলটির নীতিনির্ধারকরা বলছেন, নির্বাচন কমিশন তফসিল ঘোষণার পর আইনগত কাঠামো ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে প্রার্থী বাছাই বা দলীয় সমর্থনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয় কাঠামোয় অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকায় বিএনপি আপাতত প্রকাশ্য মনোনয়ন প্রক্রিয়ার পরিবর্তে অভ্যন্তরীণ প্রস্তুতির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। দলটির লক্ষ্য হচ্ছে সম্ভাব্য প্রার্থীদের কার্যক্রম মূল্যায়ন, স্থানীয় জনপ্রিয়তা যাচাই এবং বিদ্রোহী প্রার্থীর ঝুঁকি কমিয়ে একক প্রার্থীর পক্ষে সাংগঠনিক ঐক্য নিশ্চিত করা।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, সিটি করপোরেশন, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ—সব স্তরের নির্বাচনকে সামনে রেখে মাঠপর্যায়ের নেতাদের কাছ থেকে সম্ভাব্য প্রার্থীদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন এলাকায় সম্ভাব্য প্রার্থীদের জনসংযোগ ও শক্তি প্রদর্শনের বিষয়গুলোও পর্যবেক্ষণ করছে দলের দায়িত্বশীল মহল।
বিএনপির একাধিক নেতা মনে করেন, দীর্ঘ রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় থাকা এবং এলাকায় গ্রহণযোগ্যতা অর্জনকারী নেতাদের এবার অগ্রাধিকার দেওয়া হতে পারে। একই সঙ্গে বিতর্কমুক্ত ও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির প্রার্থীদের গুরুত্ব বাড়তে পারে।
দলটির কেন্দ্রীয় পর্যায়ের নেতারা বলছেন, নির্বাচন কমিশন এখনো স্থানীয় সরকার নির্বাচনের পূর্ণাঙ্গ তফসিল ঘোষণা করেনি। ফলে আগেভাগে কোনো প্রার্থীকে সমর্থন দিলে সাংগঠনিক জটিলতা তৈরি হতে পারে।
তাদের মতে, তফসিল ঘোষণার পর আইন ও বিধিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এর আগে সম্ভাব্য প্রার্থীদের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড, জনসম্পৃক্ততা এবং স্থানীয় গ্রহণযোগ্যতা যাচাই অব্যাহত থাকবে।
সরকারি পর্যায় থেকে পাওয়া ইঙ্গিত অনুযায়ী, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর অথবা অক্টোবর থেকে ধাপে ধাপে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের কার্যক্রম শুরু হতে পারে। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন দিয়ে প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার সম্ভাবনাও আলোচনায় রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, পর্যায়ক্রমে পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ এবং সিটি করপোরেশন নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। নবগঠিত বগুড়া সিটি করপোরেশনসহ দেশের বিভিন্ন সিটিতেও একই সময়সীমার মধ্যে ভোট আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে।
ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে ঘিরেও সম্ভাব্য প্রার্থীদের তৎপরতা বাড়ছে। বিএনপির বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতারা নিজ নিজ এলাকায় সামাজিক কর্মকাণ্ড, জনসংযোগ এবং উন্নয়নমূলক উদ্যোগের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছেন।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, রাজধানীর দুই সিটির নির্বাচন শুধু স্থানীয় প্রশাসনিক নেতৃত্ব নির্ধারণ করবে না; বরং জাতীয় রাজনীতির জন্যও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করবে।
বিএনপির অভ্যন্তরীণ আলোচনায় অন্যান্য রাজনৈতিক দলের আগাম প্রস্তুতির বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ইতোমধ্যে সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে মাঠে সক্রিয় হওয়ায় বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ে নির্বাচনী কৌশল নিয়ে আলোচনা জোরদার হয়েছে।
দলটির নেতারা মনে করছেন, প্রার্থী নির্ধারণে বিলম্ব হলেও সাংগঠনিক ঐক্য বজায় রাখতে পারলে নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় বিএনপি শক্তিশালী অবস্থানে থাকবে।
বিশ্লেষকদের মতে, জাতীয় নির্বাচনের পর এটিই হবে দেশের প্রথম বড় পরিসরের স্থানীয় রাজনৈতিক পরীক্ষা। ফলে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুধু জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের বিষয় নয়; বরং রাজনৈতিক দলগুলোর সাংগঠনিক শক্তি, জনসমর্থন এবং মাঠপর্যায়ের প্রভাব যাচাইয়ের অন্যতম সূচক হয়ে উঠতে পারে।
বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দল হিসেবে বিএনপির জন্য এই নির্বাচন হবে রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা ও প্রশাসনিক সক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ মূল্যায়ন।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক তফসিল এখনো ঘোষণা না হলেও বিএনপি ইতোমধ্যে মাঠপর্যায়ে প্রস্তুতি জোরদার করেছে। দলটি আপাতত অপেক্ষার কৌশল নিলেও তফসিল ঘোষণার পর দ্রুত প্রার্থী চূড়ান্ত করে নির্বাচনী মাঠে পূর্ণমাত্রায় সক্রিয় হওয়ার পরিকল্পনা করছে। রাজনৈতিক অঙ্গনের নজর এখন নির্বাচন কমিশনের পরবর্তী পদক্ষেপ এবং বিএনপির প্রার্থী বাছাই প্রক্রিয়ার দিকে।
