দুর্বল কর্মসংস্থান তথ্য ও ডলারের পতনে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সোনার চাহিদা বাড়ছে
আন্তর্জাতিক বাজারে আবারও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে স্বর্ণের দাম। যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজারে প্রত্যাশার তুলনায় দুর্বল কর্মসংস্থান প্রবৃদ্ধি এবং ফেডারেল রিজার্ভের সম্ভাব্য সুদনীতি নিয়ে নতুন হিসাব-নিকাশের মধ্যে বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ সম্পদের দিকে ঝুঁকতে শুরু করায় শুক্রবার (৩ জুলাই) সোনার দামে উল্লেখযোগ্য উল্লম্ফন দেখা গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, সুদের হার বৃদ্ধির সম্ভাবনা কমে আসা এবং মার্কিন ডলারের দুর্বলতা স্বর্ণবাজারকে নতুন গতি দিয়েছে।
বাজার সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক লেনদেনে স্পট গোল্ডের দাম একদিনে ১ শতাংশের বেশি বেড়ে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ১৭৬ ডলারের ঘর অতিক্রম করেছে। গত জুনের শেষ সপ্তাহের পর এটিই সর্বোচ্চ অবস্থান। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের গোল্ড ফিউচার্স বাজারেও মূল্যবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে, যেখানে আগস্ট ডেলিভারির চুক্তিগুলো উচ্চ দামে লেনদেন হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার প্রকাশিত মার্কিন অর্থনৈতিক তথ্য স্বর্ণবাজারে বড় প্রভাব ফেলেছে। প্রতিবেদনে দেখা যায়, জুন মাসে যুক্তরাষ্ট্রে অকৃষি খাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম। অর্থনীতিবিদদের পূর্বাভাসের সঙ্গে বাস্তব চিত্রের এই ব্যবধান বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ায় এখন অনেকেই মনে করছেন, ফেডারেল রিজার্ভ আগের তুলনায় সুদের হার বৃদ্ধির ক্ষেত্রে আরও সতর্ক অবস্থান নিতে পারে। সাধারণত সুদের হার কম থাকলে বা বাড়ার সম্ভাবনা কমে গেলে স্বর্ণের মতো সুদবিহীন সম্পদের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বৃদ্ধি পায়।
দুর্বল কর্মসংস্থান তথ্য প্রকাশের পর মার্কিন ডলারও চাপের মুখে পড়ে। বৈশ্বিক মুদ্রাবাজারে ডলারের মান কমে যাওয়ায় অন্যান্য দেশের ক্রেতাদের জন্য স্বর্ণ তুলনামূলক সাশ্রয়ী হয়ে ওঠে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার চাহিদা বাড়ে এবং দামও ঊর্ধ্বমুখী হয়।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ডলারের পতন ও স্বর্ণের মূল্যবৃদ্ধির মধ্যে দীর্ঘদিনের একটি বিপরীতমুখী সম্পর্ক রয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিও সেই ধারাকেই শক্তিশালী করছে।
বিশ্বব্যাপী কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর স্বর্ণ ক্রয়ের প্রবণতাও বাজারকে সমর্থন দিচ্ছে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের রিজার্ভে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ নতুন স্বর্ণ যুক্ত করেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৈচিত্র্যময় করার কৌশলের কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো স্বর্ণের ওপর নির্ভরতা বাড়াচ্ছে। এই প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে স্বর্ণের দামের জন্য ইতিবাচক সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
শুধু স্বর্ণ নয়, আন্তর্জাতিক বাজারে রূপা, প্লাটিনাম এবং প্যালাডিয়ামের দামও এ সপ্তাহে বাড়তির দিকে রয়েছে। শিল্প খাতের চাহিদা, বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রভাবে মূল্যবান ধাতুর বাজার সামগ্রিকভাবে ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের মূল্যবৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে এর প্রভাব দেশের বাজারেও পড়তে পারে। বাংলাদেশে স্বর্ণের দাম নির্ধারণে বৈশ্বিক বাজার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে আন্তর্জাতিক দামের ঊর্ধ্বগতি অব্যাহত থাকলে স্থানীয় বাজারেও নতুন করে দাম সমন্বয়ের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
বিশ্ব অর্থনীতির বর্তমান অনিশ্চয়তা, মার্কিন সুদনীতি নিয়ে জল্পনা এবং ডলারের দুর্বলতার কারণে স্বর্ণ আবারও বিনিয়োগকারীদের আস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর বাড়তি চাহিদা এবং নিরাপদ বিনিয়োগের প্রবণতা অব্যাহত থাকলে আগামী সপ্তাহগুলোতেও আন্তর্জাতিক স্বর্ণবাজারে ঊর্ধ্বমুখী ধারা বজায় থাকতে পারে।
