বাংলাদেশের পাহাড়ি এলাকায় কফি চাষের সম্ভাবনা নতুন করে সামনে এসেছে। বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির পাহাড়ি পরিবেশ কফি চাষের জন্য উপযোগী হতে পারে বলে সরকারি গবেষণা ও প্রকল্পসংক্রান্ত নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। পাহাড়ি জমি, মাটি, তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের বৈশিষ্ট্যকে এ সম্ভাবনার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বাংলাদেশে কফি চাষের উদ্যোগ অবশ্য নতুন নয়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের একটি প্রকল্পসংক্রান্ত নথি অনুযায়ী, ১৯৬১-৬২ সালের দিকে চট্টগ্রাম পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর আফ্রিকা থেকে সংগ্রহ করা কফির চারা পাহাড়ি এলাকায় রোপণ করেছিল। তবে সে সময় কফি বিক্রি ও প্রক্রিয়াজাতকরণের পর্যাপ্ত সুযোগ না থাকায় অনেক কৃষক পরে কফি গাছ কেটে ফেলেন।
এরপর দীর্ঘ সময় ধরে উৎপাদন, বাজারজাতকরণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং কৃষকদের প্রয়োজনীয় সহায়তার ঘাটতির কারণে পাহাড়ে কফি চাষের সম্ভাবনা বড় পরিসরে কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট পাহাড়ি এলাকায় কফির বিভিন্ন জাত ও বংশগত উপাদান নিয়ে গবেষণা করছে। খাগড়াছড়ির পাহাড়ি কৃষি গবেষণা কেন্দ্রে রোবাস্তা কফির একাধিক বংশগত উপাদান নিয়ে গবেষণা হয়েছে। রাঙামাটির রাইখালী এলাকাতেও কফি নিয়ে গবেষণা চালানো হয়েছে।
বিশ্বে কফির পরিচিত দুই ধরন হলো আরবিকা ও রোবাস্তা। বাংলাদেশেও এ দুই ধরনের কফি নিয়ে গবেষণা চলছে। খাগড়াছড়ির পাহাড়ি কৃষি গবেষণা কেন্দ্রে আরবিকা ও রোবাস্তা উভয় ধরনের কফির বংশগত উপাদান নিয়ে কাজের তথ্য রয়েছে।
গবেষণার মাধ্যমে বাংলাদেশের মাটি ও আবহাওয়ার সঙ্গে কোন ধরনের কফি বেশি মানানসই, কোন জাত থেকে ভালো ফলন পাওয়া সম্ভব এবং রোগবালাইসহ বিভিন্ন সমস্যা কীভাবে মোকাবিলা করা যায়, তা খুঁজে দেখা হচ্ছে।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের একটি নথি অনুযায়ী, দেশে রোবাস্তা ধরনের ‘বারি কফি-১’ নামে একটি জাত অবমুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি আরবিকা ধরনের আরেকটি জাত নিয়েও কাজ চলছে।
কফি চাষের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে গত কয়েক বছরে পাহাড়ি এলাকার কৃষকদের মধ্যে আগ্রহ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের কাজুবাদাম ও কফি গবেষণা, উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্পের আওতায় কফি চাষের এলাকা বাড়ানো, কৃষকদের প্রশিক্ষণ এবং উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তি উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
২০২৫ সালেও রাঙামাটিতে কফি ও কাজুবাদাম চাষ সম্প্রসারণ নিয়ে কৃষি কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত হয়। এতে রাঙামাটি সদর, নানিয়ারচর, কাপ্তাই ও কাউখালীসহ বিভিন্ন এলাকার কৃষি কর্মকর্তারা অংশ নেন। বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির বিভিন্ন এলাকাতেও কৃষি সহায়তা কার্যক্রম রয়েছে।
পাহাড়ে কফি চাষের সম্ভাবনা থাকলেও ভালো উৎপাদনের জন্য নিয়মিত পরিচর্যা প্রয়োজন। কফি গাছের সঠিক দূরত্ব, ছায়া ব্যবস্থাপনা, পানি ও সার প্রয়োগ, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ এবং উপযুক্ত সময়ে ফল সংগ্রহ গুরুত্বপূর্ণ বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।
পাহাড়ি জমির ঢাল, মাটিক্ষয় ও পানির ব্যবস্থাপনাও বড় বিষয়। ভারী বৃষ্টিতে মাটিক্ষয়, মাটির অম্লতা এবং সেচের সীমাবদ্ধতার মতো সমস্যা রয়েছে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে টেকসই কৃষি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা না গেলে দীর্ঘমেয়াদে ভালো ফলন পাওয়া কঠিন হতে পারে।
বাংলাদেশের কফির বাজার এখনো মূলত আমদানিনির্ভর। দেশে কফি পানের অভ্যাস বাড়ার সঙ্গে এর চাহিদাও বাড়ছে। ফলে পাহাড়ি এলাকায় কফি উৎপাদন বাড়ানো গেলে স্থানীয় কৃষকদের জন্য নতুন আয়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি পাহাড়ি কৃষিতে আসতে পারে বৈচিত্র্য।
তবে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি কৃষকের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা, ভালো মানের চারা সরবরাহ, প্রক্রিয়াজাতকরণের সুযোগ তৈরি এবং বাজারের সঙ্গে কৃষকদের সংযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। উৎপাদিত কফি সঠিকভাবে প্রক্রিয়াজাত করে বাজারে পৌঁছাতে পারলেই কৃষক এ খাত থেকে প্রকৃত অর্থে লাভবান হওয়ার সুযোগ পাবেন।
