ইলিশের মৌসুমের শেষ সময়ে এসে দক্ষিণাঞ্চলের নদী ও সাগরে ইলিশের আহরণ বেড়েছে। তবে এর মধ্যেই আগামী ৮ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত ২২ দিনের জন্য ইলিশ ধরায় নিষেধাজ্ঞা শুরু হতে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে নিষেধাজ্ঞা অন্তত ১০ দিন পিছিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন জেলে ও মৎস্যজীবীরা।
তাঁদের বক্তব্য, মৌসুমের শুরু থেকে কাঙ্ক্ষিত ইলিশ পাওয়া না গেলেও সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে হঠাৎ করে আহরণ বেড়েছে। এখন নিষেধাজ্ঞা শুরু হলে জেলেরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন এবং ইলিশ আহরণের লক্ষ্যমাত্রাও পূরণ নাও হতে পারে।
বরিশালের পোর্ট রোড মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের মৎস্য আড়তদার সমিতির তথ্য অনুযায়ী, ২৩ থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পোর্ট রোডের মোকামে ১ হাজার ২৮০ মণ ইলিশ এসেছে। প্রতিদিন গড়ে এসেছে ১৬০ মণ। এর আগের সপ্তাহে দৈনিক গড় সরবরাহ ছিল ৭৫ মণ।
সরবরাহ বাড়ায় বিভিন্ন আকারের ইলিশের দামও কমেছে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে মণপ্রতি দাম ১৪ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত কমেছে। দেড় কেজির বেশি ওজনের ইলিশের দাম প্রতি মণ ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা থেকে কমে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা হয়েছে। আর ১ থেকে ১ কেজি ২০০ গ্রাম ওজনের ইলিশের দাম ১ লাখ ১০ হাজার টাকা থেকে কমে ৯৬ হাজার টাকায় নেমেছে।
পোর্ট রোড মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের মৎস্য আড়তদার সমিতির সভাপতি জহির শিকদার বলেন, গত বছর ৪ অক্টোবর থেকে ইলিশ ধরা বন্ধ হয়েছিল। এবার কাঙ্ক্ষিত ইলিশ না পাওয়ায় তিনি ৩০ অক্টোবর থেকে নিষেধাজ্ঞা শুরুর দাবি জানিয়েছেন। তা সম্ভব না হলে অন্তত ১০ দিন সময় বাড়ানোর দাবি করেন তিনি।
বরিশাল বিভাগীয় মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, নিষেধাজ্ঞার সময় বিভাগের ৩ লাখ ৫৮ হাজার ৫১৬ জেলে ভিজিএফ কর্মসূচির আওতায় ২৫ কেজি করে চাল পাবেন। তবে বিভাগে নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ৪ লাখ ২২ হাজার ২৭৫ জন। ফলে ৬৩ হাজার ৭৫৯ জেলে এই সহায়তার বাইরে থাকবেন।
ভোলা সদর উপজেলার জেলে আলাউদ্দিন জানান, এবার প্রত্যাশিত ইলিশ না পাওয়ায় তাঁর ধারদেনা শোধ হয়নি। মাছ ধরতে জ্বালানি বাবদ খরচ হওয়া অর্থও উঠে আসছে না বলে জানান তিনি।
বরগুনা জেলা ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি চৌধুরী গোলাম মোস্তফাও জেলেদের কথা বিবেচনা করে নিষেধাজ্ঞার সময় কিছুটা পিছিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র মৎস্যজীবী সমিতির সভাপতি ইসরাইল পণ্ডিত নিষেধাজ্ঞার সময়ে প্রতিটি জেলে পরিবারকে ২৫ কেজির পরিবর্তে ১০০ কেজি চাল দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে ইলিশের আহরণ বেড়ে যাওয়ায় জেলে ও মৎস্যজীবীদের মধ্যে ইলিশের প্রজনন মৌসুম পিছিয়ে যাওয়ার ধারণা তৈরি হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটিকে সরাসরি বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত হিসেবে নেওয়ার সুযোগ নেই। এ বিষয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
মৎস্যবিজ্ঞানীদের তথ্য অনুযায়ী, আশি ও নব্বইয়ের দশকে বর্ষা শুরুর সঙ্গে জুলাই থেকে ইলিশের মৌসুম শুরু হয়ে অক্টোবর পর্যন্ত চলত। পরে বর্ষার সময় পিছিয়ে যাওয়ার সঙ্গে ইলিশের আহরণও আগস্ট-সেপ্টেম্বরের দিকে সরে এসেছে।
গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক দীনেশ চন্দ্র সাহা ও শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক মীর মোহাম্মদ আলী জানান, বর্তমানে সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে ইলিশের আহরণ বাড়ায় প্রজনন মৌসুমের সময় পরিবর্তন হয়েছে কি না, সে প্রশ্ন উঠেছে। তবে এ বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও মৎস্যবিজ্ঞানী মো. আবদুল ওহাবও ইলিশের প্রজনন মৌসুমে পরিবর্তন ঘটছে কি না, তা নিয়ে গবেষণার প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছেন।
ইলিশ ধরার নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন নিয়েও মৎস্য বিভাগের সামনে অর্থসংকট বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২০ সাল থেকে ‘ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের’ আওতায় নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হতো। গত জুনে প্রকল্পটির মেয়াদ শেষ হওয়ায় এবার সীমিত বরাদ্দের মধ্যে অভিযান পরিচালনা করতে হবে।
বরিশাল বিভাগীয় মৎস্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, প্রচার-প্রচারণা, সচেতনতামূলক কর্মসূচি, অভিযান পরিচালনার যানবাহন ও নৌযানের জ্বালানি এবং অন্যান্য কারিগরি কাজে এবার বরাদ্দ গত বছরের তুলনায় কমেছে। আগের বছরগুলোর তুলনায় এবার বরাদ্দ প্রায় চার ভাগের এক ভাগে নেমে এসেছে। একই সময়ে জ্বালানি তেলের দামও বেড়েছে।
বিভাগীয় মৎস্য অধিদপ্তরের জ্যেষ্ঠ সহকারী পরিচালক মো. আনিসুজ্জামান বলেন, ভিজিএফের চালের বরাদ্দ আগেভাগে আসায় সুবিধা হয়েছে। তবে অভিযান পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত অর্থ না থাকায় সমস্যা তৈরি হয়েছে। অভিযান কমে গেলে নিষেধাজ্ঞার সময়ে অবৈধ জাল দিয়ে মাছ ধরার প্রবণতা বাড়তে পারে, যা ইলিশের উৎপাদনে প্রভাব ফেলতে পারে।
