পিরোজপুরের নেছারাবাদ (স্বরূপকাঠি) উপজেলা এখন দেশের অন্যতম বড় চারা উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চারা সরবরাহ করে গড়ে উঠেছে বড় বাজার। প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো এই নার্সারি শিল্প বদলে দিয়েছে স্থানীয় গ্রামীণ অর্থনীতি এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করেছে হাজারো মানুষের।
নেছারাবাদের মাতুয়াইল-আটঘর কুড়িয়ানা এলাকার অনুকূল আবহাওয়া ও পলিমাটিকে কাজে লাগিয়ে বংশপরম্পরায় চারা উৎপাদনের দক্ষতা তৈরি হয়েছে স্থানীয়দের মধ্যে। ধীরে ধীরে এ শিল্প পুরো উপজেলায় বিস্তৃত হয়েছে।
নেছারাবাদের প্রায় ৩৮টি গ্রামের ৫০০ হেক্টর কৃষিজমিতে বড় ও ছোট নার্সারি গড়ে উঠেছে। সরকারি ও বেসরকারি হিসাব অনুযায়ী, উপজেলায় নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত মিলিয়ে মোট ৩৯৩টি নার্সারি রয়েছে।
এখানে আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু, মাল্টা ও ড্রাগন ফলসহ বিভিন্ন ফলদ গাছের চারা উৎপাদন করা হয়। পাশাপাশি গোলাপ, জবা, রজনীগন্ধাসহ বিভিন্ন ফুল, মেহগনি, কড়ই, সেগুনের মতো বনজ এবং বিভিন্ন ঔষধি গাছের চারাও পাওয়া যায়। চারা উৎপাদনে বৈজ্ঞানিক ও ঐতিহ্যবাহী—দুই ধরনের পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়।
সারা বছর নার্সারিতে পরিচর্যার কাজ চললেও বর্ষা মৌসুমে ব্যস্ততা বেড়ে যায়। বৃষ্টি শুরু হলে চারা তোলা, নতুন প্লাস্টিক ব্যাগে মাটি ভরা, টব তৈরি ও কলম বাঁধার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন উদ্যোক্তা ও শ্রমিকরা।
নেছারাবাদের উৎপাদিত চারা শুধু পিরোজপুরেই বিক্রি হয় না। সড়ক ও নৌপথে প্রতিদিন শত শত ট্রাক ও ট্রলারভর্তি চারা ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হয়। অনলাইন ও অফলাইন—দুই মাধ্যমেই গড়ে উঠেছে বড় বাজার।
নার্সারি শিল্পের কারণে স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থানের সুযোগও বেড়েছে। একসময় কাজের সন্ধানে শহরমুখী হওয়া তরুণদের অনেকে এখন নিজ এলাকায় নার্সারি গড়ে আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করেছেন। এ শিল্পের সঙ্গে যুক্ত হয়ে শত শত বেকার যুবক উদ্যোক্তা হয়েছেন।
চারা নিড়ানি, পানি দেওয়া, চারা আটি বাঁধা ও পরিবহনের মতো বিভিন্ন কাজে যুক্ত রয়েছেন বহু শ্রমিক। তাদের অনেকের সংসার ও সন্তানদের পড়াশোনার খরচ এই কাজের আয়ের ওপর নির্ভরশীল।
নার্সারি শিল্পকে কেন্দ্র করে পলিথিন ব্যাগ, জৈব ও রাসায়নিক সার, মাটির টব, বাঁশের খাঁচা ও সুতলির মতো আনুষঙ্গিক উপকরণের ব্যবসাও গড়ে উঠেছে। পাশাপাশি পরিবহন শ্রমিক, পাইকারি চারা ব্যবসায়ী ও খুচরা বিক্রেতারাও এ খাত থেকে লাভবান হচ্ছেন।
পিরোজপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে মোট ৪৩৭টি নার্সারি রয়েছে। এর মধ্যে ৩৯৩টিই নেছারাবাদে। শুধু নেছারাবাদের নার্সারি খাত থেকে প্রতিবছর প্রায় ২০ থেকে ২৫ কোটি টাকার বাণিজ্য হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি নার্সারি শিল্প পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায়ও ভূমিকা রাখছে। প্রতিবছর এখান থেকে উৎপাদিত লাখ লাখ গাছের চারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে রোপণ করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে সবুজায়ন, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় ভূমিকা রাখছে এ শিল্প।
স্থানীয় এক উদ্যোক্তার ভাষ্য, বর্ষা মৌসুম তাদের ব্যবসার প্রধান সময়। এ সময়ে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে পাইকার ও বাগানপ্রেমীরা সরাসরি নেছারাবাদে এসে চারা কেনেন। তার মতে, নার্সারি করে তারা স্বাবলম্বী হওয়ার পাশাপাশি বহু মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পেরেছেন।
পিরোজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সৌমিত্র সরকার বলেন, জেলার সিংহভাগ নার্সারি নেছারাবাদকেন্দ্রিক। বাণিজ্যিকভাবে এ খাত অত্যন্ত সম্ভাবনাময় এবং প্রতিবছর এ খাত থেকে ২০ থেকে ২৫ কোটি টাকার লেনদেন স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করছে।
উদ্যোক্তাদের মতে, সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ, আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তির প্রশিক্ষণ, চারা সংরক্ষণের অবকাঠামো, উন্নত পরিবহন ও সুসংগঠিত বাজারব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে নেছারাবাদের চারা বিদেশে রপ্তানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
