নেপালের নতুন প্রধানমন্ত্রী বালেন শাহ কোন ধর্মের—নেপালের রাজনীতিতে তাঁর দ্রুত উত্থানের পর এই প্রশ্নটি নিয়ে মানুষের আগ্রহ বেড়েছে। বালেন্দ্র শাহ, যিনি ‘বালেন শাহ’ নামে বেশি পরিচিত, শুধু একজন রাজনীতিবিদ নন; তিনি একজন প্রকৌশলী, র্যাপ সংগীতশিল্পী এবং কাঠমান্ডু মহানগরের সাবেক মেয়র। ২০২৬ সালের মার্চে তিনি নেপালের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর জন্ম, শিক্ষাজীবন, পেশা, সংগীতচর্চা এবং রাজনীতিতে উত্থানের পাশাপাশি তাঁর ধর্মীয় পরিচয়ও এখন আলোচনায় রয়েছে।
বালেন্দ্র শাহ ১৯৯০ সালের ২৭ এপ্রিল নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুর নারাদেবীতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা রাম নারায়ণ শাহ একজন আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক ছিলেন। তাঁর পারিবারিক শিকড় মহোত্তরী অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ছোটবেলা থেকেই বালেনের কবিতা ও সংগীতের প্রতি আগ্রহ ছিল। পরবর্তী সময়ে সেই আগ্রহই তাঁকে র্যাপ সংগীতের জগতে নিয়ে যায় এবং নেপালের তরুণদের মধ্যে তাঁর আলাদা পরিচিতি তৈরি হয়।
শৈশবের পড়াশোনায় বালেন খুব বেশি মনোযোগী ছিলেন না বলে তাঁর জীবনী নিয়ে প্রকাশিত কিছু প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কাঠমান্ডু পোস্টের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, তৃতীয় শ্রেণিতে ওঠার পর তিনি নিয়মিত স্কুলে যাওয়া শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে অবশ্য পড়াশোনায় তিনি যথেষ্ট এগিয়ে যান এবং প্রকৌশল বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন।
বালেন শাহ নেপালে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে পড়াশোনা করেন। এরপর তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য ভারতে যান এবং স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। প্রকৌশল বিষয়ে তাঁর শিক্ষাগত পটভূমি পরবর্তীতে অবকাঠামো, নগর পরিকল্পনা ও নির্মাণসংক্রান্ত বিষয়ে কাজ করার ক্ষেত্রে কাজে আসে। রাজনীতিতে প্রবেশের আগে তিনি প্রকৌশলী হিসেবেও পেশাগতভাবে কাজ করেছেন।
প্রকৌশলী হওয়ার পাশাপাশি বালেন শাহ সংগীতের সঙ্গেও সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। নেপালের র্যাপ সংগীতের ক্ষেত্রে তিনি পরিচিত একটি নাম হয়ে ওঠেন। তিনি গান লিখেছেন, র্যাপ করেছেন এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক বিভিন্ন বিষয় তাঁর গানে তুলে ধরেছেন। তাঁর গানের কথায় প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থা, সামাজিক সমস্যা এবং তরুণদের বিভিন্ন বিষয় উঠে আসত। এই সংগীতচর্চাই তাঁকে রাজনীতির বাইরে থেকেও সাধারণ মানুষের কাছে পরিচিত করে তোলে।
২০১৫ সালের গোরখা ভূমিকম্পের পর বালেন শাহ প্রকৌশলগত জ্ঞান ব্যবহার করে বিভিন্ন কার্যক্রমে যুক্ত ছিলেন বলে সংবাদ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত কাঠামো এবং পুনর্গঠনসংক্রান্ত কাজে তাঁর প্রকৌশল জ্ঞান কাজে লাগে। পরবর্তীকালে নগর ব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামো উন্নয়নের বিষয়ে তাঁর আগ্রহও আরও দৃশ্যমান হয়।
বালেন শাহের রাজনৈতিক জীবনের বড় পরিবর্তন আসে ২০২২ সালে। ওই বছর তিনি কোনো প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলের প্রার্থী হিসেবে নয়, স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে কাঠমান্ডু মহানগরের মেয়র নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। প্রচলিত রাজনৈতিক দলের বাইরে থেকে নির্বাচনে অংশ নিয়ে তিনি জয় লাভ করেন এবং কাঠমান্ডুর মেয়র হন। তাঁর এই জয় নেপালের রাজনীতিতে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করে।
মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করার সময় বালেন শাহ নগর ব্যবস্থাপনা, অবৈধ স্থাপনা, ফুটপাত দখল, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং শহরের অবকাঠামো নিয়ে বিভিন্ন উদ্যোগ নেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর সক্রিয় উপস্থিতি এবং সরাসরি বক্তব্যের কারণে তিনি তরুণদের মধ্যে জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। মেয়র হিসেবে তাঁর কর্মকাণ্ড তাঁকে স্থানীয় রাজনীতির গণ্ডি ছাড়িয়ে জাতীয় পর্যায়ে পরিচিত করে তোলে।
এরপর বালেন শাহ জাতীয় রাজনীতিতে প্রবেশের সিদ্ধান্ত নেন। ২০২৬ সালের শুরুতে তিনি কাঠমান্ডুর মেয়র পদ থেকে সরে দাঁড়ান এবং রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা পার্টি বা Rastriya Swatantra Party (RSP)-তে যোগ দেন। এরপর তিনি দলটির হয়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেন।
২০২৬ সালের ৫ মার্চ অনুষ্ঠিত নেপালের সংসদ নির্বাচনে বালেন শাহ ঝাপা-৫ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ওই নির্বাচনে তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও CPN-UML-এর চেয়ারম্যান কে পি শর্মা ওলিকে পরাজিত করেন। নির্বাচনে শাহ ৬৮ হাজার ৩৪৮ ভোট পান, আর ওলি পান ১৮ হাজার ৭৩৪ ভোট। এই জয় তাঁকে জাতীয় সংসদে প্রবেশের সুযোগ দেয় এবং পরবর্তী সময়ে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পথ তৈরি করে।
২০২৬ সালের নির্বাচনে রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা পার্টি হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসে ১৮২টি আসন লাভ করে। এরপর বালেন শাহ দলটির সংসদীয় নেতা নির্বাচিত হন। নেপালের সংবিধানের ৭৬(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি রামচন্দ্র পৌডেল তাঁকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেন। ২০২৬ সালের ২৭ মার্চ রাজধানী কাঠমান্ডুর শীতল নিবাসে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন।
বালেন শাহের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান ধর্মীয় দিক থেকেও আলোচনায় আসে। অনুষ্ঠানে হিন্দু বৈদিক মন্ত্র পাঠ করা হয় এবং বৌদ্ধ ভিক্ষুরাও ধর্মীয় প্রার্থনা ও অষ্টমঙ্গল পাঠ করেন। নেপালের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম রেডিও নেপালের প্রতিবেদনে বলা হয়, অনুষ্ঠানে তরুণ পুরোহিতদের মাধ্যমে বৈদিক মন্ত্র পাঠের পাশাপাশি বৌদ্ধ ভিক্ষু ও লামাদের মাধ্যমে মঙ্গলাচরণ করা হয়। ফলে শপথ অনুষ্ঠানটি নেপালের বহুধর্মীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের একটি প্রতিফলন হিসেবেও দেখা হয়।
এখন প্রশ্ন হলো, নেপালের নতুন প্রধানমন্ত্রী বালেন শাহ কোন ধর্মের? সরাসরি উত্তর হলো, বালেন শাহ হিন্দু ধর্মীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত। তাঁর প্রকাশ্য ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে হিন্দু ধর্মীয় রীতির উপস্থিতি দেখা যায়। বিশেষ করে ২০২৬ সালের নির্বাচনী প্রচারণার সময় তিনি জনকপুরের ঐতিহাসিক জানকী মন্দিরে গিয়ে পূজা ও প্রার্থনা করেন বলে কাঠমান্ডু পোস্টের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণের সময়ও হিন্দু বৈদিক মন্ত্র ও ধর্মীয় আচার পালন করা হয়।
তবে বালেন শাহের ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। তাঁর শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে হিন্দু ধর্মীয় রীতির পাশাপাশি বৌদ্ধ ধর্মীয় আচারও পালন করা হয়েছিল। নেপালে হিন্দু ও বৌদ্ধ সংস্কৃতির দীর্ঘদিনের সহাবস্থান রয়েছে এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠানে একাধিক ধর্মীয় ঐতিহ্যের রীতি দেখা যায়। তাই তাঁর শপথ অনুষ্ঠানে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের উপস্থিতি তাঁর ব্যক্তিগত ধর্মীয় পরিচয়কে বৌদ্ধ হিসেবে প্রমাণ করে না।
বালেন শাহের ধর্মীয় পরিচয়ের ক্ষেত্রে তাঁর ব্যক্তিগত কর্মকাণ্ডও গুরুত্বপূর্ণ। জনকপুরের জানকী মন্দিরে তাঁর পূজা করার বিষয়টি প্রকাশিত হয়েছে এবং তাঁর শপথ অনুষ্ঠানে হিন্দু বৈদিক আচারও ছিল। এসব প্রকাশ্য তথ্যের ভিত্তিতে তাঁকে হিন্দু ধর্মীয় ঐতিহ্যের অনুসারী হিসেবে বর্ণনা করা হয়। একই সঙ্গে নেপালের বহুধর্মীয় সমাজের কারণে তাঁর রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে বৌদ্ধ ধর্মীয় রীতির উপস্থিতিও দেখা গেছে।
বালেন শাহের রাজনৈতিক উত্থানও তাঁর পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তিনি দীর্ঘদিন কোনো প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে ছিলেন না। প্রকৌশলী ও র্যাপার হিসেবে পরিচিতি পাওয়ার পর তিনি ২০২২ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে কাঠমান্ডুর মেয়র নির্বাচিত হন। মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে স্থানীয় সরকার থেকে জাতীয় রাজনীতিতে উঠে এসে প্রধানমন্ত্রী হওয়া তাঁর রাজনৈতিক জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর বালেন শাহ এখন জাতীয় পর্যায়ে নেপালের সরকার পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন। স্থানীয় সরকারের একজন মেয়র হিসেবে তাঁর কাজের ক্ষেত্র ছিল মূলত কাঠমান্ডু মহানগরকে কেন্দ্র করে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর দায়িত্ব অনেক বিস্তৃত। দেশের অর্থনীতি, অবকাঠামো, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, প্রশাসন, পররাষ্ট্রনীতি এবং জাতীয় উন্নয়নসহ বিভিন্ন বিষয়ে তাঁকে সরকারের নেতৃত্ব দিতে হবে।
বালেন শাহের জীবনের দিকে তাকালে দেখা যায়, তাঁর পথচলা প্রচলিত রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের মতো ছিল না। প্রকৌশল শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার পর তিনি পেশাগতভাবে কাজ করেছেন, র্যাপ সংগীতের মাধ্যমে পরিচিতি পেয়েছেন, এরপর স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে কাঠমান্ডুর মেয়র হয়েছেন এবং শেষ পর্যন্ত জাতীয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেছেন। ২০২৬ সালের নির্বাচনের পর তিনি নেপালের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
সুতরাং, নেপালের নতুন প্রধানমন্ত্রী বালেন শাহ হিন্দু ধর্মীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত। তাঁর প্রকাশ্য ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে হিন্দু রীতির উপস্থিতি রয়েছে এবং জনকপুরের জানকী মন্দিরে তাঁর পূজা করার বিষয়টিও সংবাদে এসেছে। তবে তাঁর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে হিন্দু ও বৌদ্ধ—উভয় ধর্মীয় রীতি পালন করা হয়েছিল। তাই তাঁর ধর্মীয় পরিচয় ব্যাখ্যা করার সময় ব্যক্তিগত ধর্মীয় কর্মকাণ্ড এবং নেপালের বহুধর্মীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য—দুই বিষয়ই বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
বালেন শাহের জন্ম ও শিক্ষাজীবন থেকে শুরু করে প্রকৌশলী হিসেবে কর্মজীবন, র্যাপ সংগীতের সঙ্গে যুক্ত হওয়া, কাঠমান্ডুর মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন এবং পরবর্তীতে জাতীয় রাজনীতিতে প্রবেশ—প্রতিটি ধাপই তাঁর বর্তমান পরিচয় গঠনে ভূমিকা রেখেছে। ২০২৬ সালে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার মধ্য দিয়ে তাঁর রাজনৈতিক জীবনে নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে। তাঁর ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে আগ্রহ থাকলেও তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবন ও রাজনৈতিক পথচলাও নেপালের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
