পাকিস্তানের প্রথম প্রধানমন্ত্রী কে ছিলেন—পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাসে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। পাকিস্তানের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ছিলেন নওয়াবজাদা লিয়াকত আলী খান। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট তিনি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ১৯৫১ সালের ১৬ অক্টোবর নিহত হওয়া পর্যন্ত এই পদে ছিলেন। পাকিস্তানের ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির সরকারি তালিকাতেও লিয়াকত আলী খানকে প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখানো হয়েছে এবং তার মেয়াদ ১৫ আগস্ট ১৯৪৭ থেকে ১৬ অক্টোবর ১৯৫১ পর্যন্ত উল্লেখ করা হয়েছে।
লিয়াকত আলী খানের পুরো নাম ছিল নওয়াবজাদা লিয়াকত আলী খান। তিনি ১৮৯৫ সালের ১ অক্টোবর তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের কর্নাল অঞ্চলে একটি সম্ভ্রান্ত ও সম্পদশালী জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পরিবার উত্তর ভারতের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিমণ্ডলে পরিচিত ছিল। শৈশব থেকেই তিনি ধর্মীয় ও সাধারণ শিক্ষার সুযোগ পান। পরবর্তী সময়ে তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য আলিগড়ে যান এবং এরপর ব্রিটেনে পড়াশোনা করেন। তার শিক্ষাজীবন তাকে আইন ও রাজনীতির ক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ ভূমিকার জন্য প্রস্তুত করে।
শিক্ষাজীবনে লিয়াকত আলী খান Muhammadan Anglo-Oriental College, Aligarh-এ পড়াশোনা করেন। পরে তিনি যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং Exeter College-এর সঙ্গে যুক্ত থেকে আইন ও জুরিসপ্রুডেন্স নিয়ে পড়াশোনা করেন। ১৯২২ সালে তিনি ইংল্যান্ডের Inner Temple থেকে ব্যারিস্টার হিসেবে আইন পেশায় প্রবেশের যোগ্যতা অর্জন করেন। এরপর ভারতে ফিরে এলেও তিনি দীর্ঘ সময় আইন পেশায় মনোনিবেশ না করে রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন।
লিয়াকত আলী খানের রাজনৈতিক জীবনের শুরু হয় ব্রিটিশ ভারতের আইনসভাকেন্দ্রিক রাজনীতির মধ্য দিয়ে। ১৯২৩ সালে তিনি অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগে যোগ দেন। ১৯২৬ সালে তিনি ইউনাইটেড প্রভিন্সেসের আইন পরিষদে নির্বাচিত হন। সেখানে তিনি রাজনৈতিক কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি মুসলিম লীগের সংগঠন ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। ধীরে ধীরে তিনি মুসলিম লীগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংগঠক হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন।
লিয়াকত আলী খানের রাজনৈতিক উত্থানের সঙ্গে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর সম্পর্কও গভীরভাবে যুক্ত ছিল। ১৯৩০-এর দশকে মুসলিম লীগের সাংগঠনিক কার্যক্রমে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৩৬ সালে জিন্নাহ তাকে মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব দেন। এরপর দীর্ঘ সময় তিনি সংগঠনের সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করেন এবং জিন্নাহর ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহযোগী হিসেবে কাজ করেন। মুসলিম লীগের সভা, সম্মেলন, প্রচার ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে তার ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।
১৯৪০-এর দশকে ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনীতিতে মুসলিম লীগের পৃথক রাষ্ট্রের দাবি ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। লিয়াকত আলী খান এ সময় মুসলিম লীগের অন্যতম প্রধান নেতা হিসেবে কাজ করেন। ১৯৪০ সালে তিনি কেন্দ্রীয় আইনসভায় নির্বাচিত হন এবং মুসলিম লীগের সংসদীয় দলের উপনেতার ভূমিকা পালন করেন। ১৯৪৬ সালে ব্রিটিশ ভারতের অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হলে তিনি সেখানে অর্থ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। অর্থনৈতিক নীতি ও বাজেট নিয়ে তার ভূমিকা তাকে ব্রিটিশ ভারতীয় রাজনীতিতে আরও পরিচিত করে তোলে।
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসান এবং ভারত বিভক্তির পর পাকিস্তান একটি নতুন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ১৫ আগস্ট ১৯৪৭ থেকে লিয়াকত আলী খান পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন। অন্যদিকে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ পাকিস্তানের প্রথম গভর্নর জেনারেল হন। পাকিস্তানের প্রথম দিকের সরকারকে কার্যত শূন্য থেকে একটি কেন্দ্রীয় প্রশাসন গড়ে তুলতে হয়েছিল। সরকারি প্রতিষ্ঠান, অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, প্রশাসনিক কাঠামো এবং বিপুলসংখ্যক শরণার্থীর পুনর্বাসন—সবকিছুই নতুন সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল।
দেশভাগের পর ভারত থেকে পাকিস্তানে বিপুলসংখ্যক মুসলিম শরণার্থী এবং পাকিস্তান থেকে ভারতে হিন্দু ও শিখ জনগোষ্ঠীর স্থানান্তর ঘটে। নতুন পাকিস্তান সরকারকে বিপুলসংখ্যক শরণার্থীর আবাসন, খাদ্য, নিরাপত্তা ও পুনর্বাসনের মতো বিষয় মোকাবিলা করতে হয়। লিয়াকত আলী খানের সরকার একই সময়ে নতুন রাষ্ট্রের প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা এবং অর্থনৈতিক কাঠামো প্রতিষ্ঠার কাজও চালিয়ে যায়। তার প্রধানমন্ত্রিত্বের প্রথম কয়েক বছর তাই রাষ্ট্র গঠনের প্রাথমিক পর্যায়ের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিল।
লিয়াকত আলী খানের প্রধানমন্ত্রিত্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল Objectives Resolution বা উদ্দেশ্য প্রস্তাব। ১৯৪৯ সালের ৭ মার্চ তিনি পাকিস্তানের গণপরিষদে এই প্রস্তাব উত্থাপন করেন। প্রস্তাবটি পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ সাংবিধানিক কাঠামোর জন্য কিছু মৌলিক নীতি নির্ধারণের উদ্দেশ্যে আনা হয়েছিল। ১২ মার্চ ১৯৪৯ গণপরিষদ এটি গ্রহণ করে। পাকিস্তানের ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির সরকারি ইতিহাসে এই প্রস্তাবকে পাকিস্তানের সাংবিধানিক বিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
৭ মার্চ ১৯৪৯ সালে উদ্দেশ্য প্রস্তাব নিয়ে বক্তব্য দেওয়ার সময় লিয়াকত আলী খান রাষ্ট্র পরিচালনা, নাগরিকদের অধিকার, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার এবং পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কাঠামো সম্পর্কে তার সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন। তার সেই বক্তব্য পাকিস্তানের প্রথম দিকের সাংবিধানিক বিতর্কের গুরুত্বপূর্ণ দলিলগুলোর একটি হিসেবে সংরক্ষিত রয়েছে। পাকিস্তানের ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির আর্কাইভে ৭ মার্চ ১৯৪৯ সালের গণপরিষদের বিতর্কের নথিতে তার বক্তব্য পাওয়া যায়।
ভারতের সঙ্গে সম্পর্কও লিয়াকত আলী খানের প্রধানমন্ত্রিত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর কাশ্মীর, শরণার্থী, সম্পদ ও সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন ইস্যুতে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়। এই পরিস্থিতিতে ভারত ও পাকিস্তানের সরকার দুই দেশের সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা এবং সম্পত্তি-সংক্রান্ত সমস্যার সমাধানের জন্য আলোচনা করে। লিয়াকত আলী খান ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর মধ্যে আলোচনার ফল হিসেবে ১৯৫০ সালে Nehru-Liaquat Pact বা Delhi Pact সম্পাদিত হয়।
এই চুক্তির অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল দুই দেশে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং দেশভাগের পর সৃষ্ট কিছু মানবিক ও সম্পত্তি-সংক্রান্ত সমস্যার মোকাবিলা করা। ভারত সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঐতিহাসিক নথিতেও লিয়াকত আলী খান ও নেহরুর মধ্যে ১৯৫০ সালের এই সমঝোতার উল্লেখ রয়েছে।
লিয়াকত আলী খানের সরকারকে কাশ্মীর ইস্যুতেও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরপরই কাশ্মীর নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সংঘাত শুরু হয় এবং এই বিষয়টি দুই দেশের সম্পর্কের কেন্দ্রীয় ইস্যুতে পরিণত হয়। লিয়াকত আলী খান আন্তর্জাতিক ও কমনওয়েলথ পর্যায়েও পাকিস্তানের অবস্থান তুলে ধরেন। তার প্রধানমন্ত্রিত্বের সময় ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক, নিরাপত্তা এবং নতুন রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক অবস্থান—সবগুলো বিষয় পরস্পরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিল।
১৯৪৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর মৃত্যুর পর পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও পরিবর্তন আসে। জিন্নাহ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রথম গভর্নর জেনারেল হিসেবে সরকারের ওপর ব্যাপক প্রভাব রাখতেন। তার মৃত্যুর পর লিয়াকত আলী খান সরকারের নেতৃত্বে আরও গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে চলে আসেন। ফলে পাকিস্তানের রাষ্ট্র পরিচালনা, সাংবিধানিক বিকাশ এবং রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান গঠনে তার ভূমিকা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
লিয়াকত আলী খানের ব্যক্তিগত জীবনও তার রাজনৈতিক জীবনের সঙ্গে যুক্ত ছিল। তার স্ত্রী বেগম রানা লিয়াকত আলী খান পরবর্তীতে পাকিস্তানের সামাজিক ও জনজীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি নারীর শিক্ষা, সামাজিক উন্নয়ন এবং শরণার্থী সহায়তাসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন। লিয়াকত আলী খানের পরিবার পাকিস্তানের প্রথম দিকের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত ছিল।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে লিয়াকত আলী খানকে একই সঙ্গে অর্থনৈতিক সমস্যা, শরণার্থী পুনর্বাসন, প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান গঠন এবং পররাষ্ট্রনীতির মতো একাধিক বিষয় মোকাবিলা করতে হয়। পাকিস্তানের মতো সদ্য প্রতিষ্ঠিত একটি রাষ্ট্রের জন্য কেন্দ্রীয় সরকার, অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ও প্রশাসনিক কাঠামো প্রতিষ্ঠা ছিল বড় কাজ। তার সময়েই পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ সংবিধান ও রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামো নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা শুরু হয়।
লিয়াকত আলী খানের রাজনৈতিক জীবন শেষ হয় ১৯৫১ সালের ১৬ অক্টোবর। সেদিন রাওয়ালপিন্ডির Company Bagh-এ একটি জনসভায় বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি গুলিবিদ্ধ হন এবং নিহত হন। পাকিস্তানের ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির সরকারি ইতিহাস অনুযায়ী, তার মৃত্যুর পর ১৭ অক্টোবর ১৯৫১ খাজা নাজিমুদ্দিন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
তার হত্যাকাণ্ড পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়। লিয়াকত আলী খানের হত্যার পর তাকে যে স্থানে হত্যা করা হয়েছিল, সেই Company Bagh-এর নাম পরিবর্তন করে Liaquat Bagh রাখা হয়। স্থানটি পরবর্তীকালে তার স্মৃতির সঙ্গে স্থায়ীভাবে যুক্ত হয়ে যায়।
লিয়াকত আলী খানের প্রধানমন্ত্রিত্ব ছিল পাকিস্তানের রাষ্ট্রগঠনের একেবারে প্রাথমিক সময়ের অংশ। তার সময়ে পাকিস্তানকে একটি নতুন রাষ্ট্র হিসেবে প্রশাসনিক ভিত্তি তৈরি করতে হয়েছে, শরণার্থী সংকট মোকাবিলা করতে হয়েছে, ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের জটিলতা সামলাতে হয়েছে এবং ভবিষ্যৎ সাংবিধানিক কাঠামো নিয়ে কাজ করতে হয়েছে। Objectives Resolution গ্রহণ এবং Nehru-Liaquat Pact তার প্রধানমন্ত্রিত্বের উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলোর মধ্যে রয়েছে।
সব মিলিয়ে, পাকিস্তানের প্রথম প্রধানমন্ত্রী কে ছিলেন—এর উত্তর হলো নওয়াবজাদা লিয়াকত আলী খান। তিনি শুধু পাকিস্তানের প্রথম প্রধানমন্ত্রীই ছিলেন না, বরং নতুন রাষ্ট্রটির প্রাথমিক প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলার সময় সরকারের নেতৃত্ব দেন। ১৯৪৭ থেকে ১৯৫১ সাল পর্যন্ত তার প্রধানমন্ত্রিত্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রগঠনের প্রথম অধ্যায়ের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। ১৯৫১ সালের ১৬ অক্টোবর তার হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে সেই অধ্যায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্বের সমাপ্তি ঘটে।
