শহরে পুরোনো ও বড় গাছের বিস্তার কমে গেলে শুধু পরিবেশের ওপরই প্রভাব পড়ে না, মানুষের মৃত্যুঝুঁকিও বাড়তে পারে। শিকাগো শহরের বিভিন্ন এলাকায় ২০১১ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব এলাকায় গাছের ক্যানোপি—অর্থাৎ পাতা ও ডালপালার বিস্তার—কমেছে, বিশেষ করে সেসব উষ্ণ এলাকায় মৃত্যুহার বেড়েছে। বিপরীতে, যেসব এলাকায় বছরজুড়ে ক্যানোপি বেড়েছে, সেখানে মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
‘জিওহেলথ’ সাময়িকীতে গত ৫ আগস্ট প্রকাশিত গবেষণাটিতে বলা হয়েছে, কোনো এলাকায় মোট কতটি গাছ আছে, তার চেয়ে বছরের পর বছর গাছের ক্যানোপি কীভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে, সেটিই স্বাস্থ্যের ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে গবেষণাটি পর্যবেক্ষণভিত্তিক হওয়ায় ক্যানোপি কমে যাওয়াই সরাসরি মৃত্যুর কারণ—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। গবেষকেরা মূলত গাছের ক্যানোপির পরিবর্তন ও মৃত্যুহারের মধ্যে সম্পর্ক বিশ্লেষণ করেছেন। একই সঙ্গে ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক উষ্ণতার সময়ে তীব্র তাপপ্রবাহ থেকে মানুষকে সুরক্ষায় শহুরে গাছপালার গুরুত্বও গবেষণায় উঠে এসেছে।
গবেষণা অনুযায়ী, বড় ও পুরোনো গাছের ছায়া পাকা রাস্তা ও ভবনের তাপ কমাতে সহায়তা করে। পাশাপাশি গাছের বাষ্পীভবন প্রক্রিয়া আশপাশের বাতাসে আর্দ্রতা বাড়িয়ে স্থানীয় তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে।
পোর্টল্যান্ড স্টেট ইউনিভার্সিটির নগর পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. বিবেক শান্দাস বলেন, গাছ মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী—এটি নতুন কোনো বিষয় নয়। তবে দীর্ঘ সময় ধরে তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের কারণে নতুন গবেষণাটি গুরুত্বপূর্ণ।
গবেষকেরা ২০১১ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর শিকাগোর বিভিন্ন এলাকার ক্যানোপির পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করেন। বিশ্লেষণে দেখা যায়, কোনো এলাকায় বছরে গাছের ক্যানোপি ১ শতাংশ বাড়লে সেখানে মৃত্যুহার গড়ে প্রায় ১০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। হৃদরোগ, শ্বাসকষ্ট এবং মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সমস্যায় আক্রান্ত মানুষের মৃত্যুর ক্ষেত্রে এই সম্পর্ক সবচেয়ে বেশি লক্ষ করা গেছে।
গবেষণায় স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া ক্যানোপির তথ্যের সঙ্গে রাজ্য ও শহরের স্বাস্থ্য বিভাগের দুই লাখ ২০ হাজারের বেশি মৃত্যুর রেকর্ড বিশ্লেষণ করা হয়। হিসাবের সময় গ্রীষ্মের তাপমাত্রা, বায়ুদূষণ, বাসিন্দাদের আয় এবং আবাসনব্যবস্থার মতো বিষয়ও পরিসংখ্যানগত মডেলে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
গবেষণায় শিকাগোর সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের সঙ্গেও গাছের ক্যানোপির পরিবর্তনের একটি সম্পর্ক পাওয়া যায়। সাউথ সাইড ও ওয়েস্ট সাইডের মতো সুবিধাবঞ্চিত এলাকাগুলোতে ক্যানোপি কমার হার ছিল বেশি। এসব এলাকাতেই তাপমাত্রা ও মৃত্যুহার তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল। অথচ অতীতে ওই এলাকাগুলোতে প্রচুর গাছ ছিল। অন্যদিকে, লেকফ্রন্টের কাছাকাছি এলাকাগুলো তুলনামূলক শীতল ছিল এবং সেখানে মৃত্যুহারও কম দেখা গেছে।
গবেষণার সহ-লেখক ও নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির চিকিৎসাবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী হ্যারিসন গার্সিয়া জানান, শিকাগোর গাছহীন রাস্তায় হাঁটার সময় হাঁপিয়ে ওঠার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তাকে এ গবেষণায় আগ্রহী করে তোলে।
গবেষকেরা আরও হিসাব করেছেন, শিকাগরে বর্তমানে বছরে যে ১৪ হাজার গাছ লাগানো হচ্ছে, সেই হারে ক্যানোপি যদি প্রতি বছর মাত্র ০.০৩ শতাংশও বাড়ে, তাহলে বছরে অন্তত ১০৫ জনের অকালমৃত্যু ঠেকানো সম্ভব হতে পারে।
তবে অধ্যাপক বিবেক শান্দাস সতর্ক করে বলেন, নতুন লাগানো একটি চারা গাছ দ্রুত পুরোনো গাছের মতো বড় ছায়া বা পরিবেশগত সুরক্ষা দিতে পারে না। আগের গবেষণাগুলোতেও দেখা গেছে, নতুন লাগানো গাছ সময়ের সঙ্গে বড় ও পরিণত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের জীবন রক্ষায় তার সম্ভাব্য ভূমিকা বাড়ে।
গবেষণাটির সামগ্রিক বার্তা হলো, শহরে শুধু নতুন গাছ লাগানোই যথেষ্ট নয়। দীর্ঘদিন ধরে বেড়ে ওঠা বড় ও পুরোনো গাছ সংরক্ষণ করাও নগর পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র: লাইভ সায়েন্স
