নিউইয়র্কে দুই দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে নিরাপত্তা, মাদক দমন ও রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আলোচনা
বাংলাদেশ পুলিশের দক্ষতা ও পেশাগত সক্ষমতা আরও উন্নত করতে পাকিস্তানের কারিগরি ও প্রশিক্ষণ সহায়তা চেয়েছে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে আধুনিক নগর নিরাপত্তা ব্যবস্থা, মাদক পাচার প্রতিরোধ, রোহিঙ্গা সংকট এবং দ্বিপাক্ষিক নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদারের বিষয়েও দুই দেশের মধ্যে আলোচনা হয়েছে।
মঙ্গলবার (স্থানীয় সময়) যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ-পাকিস্তান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে এসব বিষয় গুরুত্ব পায়। বৈঠকে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং পাকিস্তানের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন দেশটির ইন্টেরিয়র ও মাদক নিয়ন্ত্রণবিষয়ক মন্ত্রী সৈয়দ মহসিন নাকভী।
বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, পরিবর্তিত নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশ পুলিশের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য আধুনিক ও উচ্চতর প্রশিক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে। এ ক্ষেত্রে পাকিস্তানের অভিজ্ঞতা ও সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তিনি পাকিস্তানের বিভিন্ন শহরে বাস্তবায়িত ‘সেফ সিটি’ প্রকল্পের প্রশংসা করে বলেন, প্রযুক্তিনির্ভর নগর নিরাপত্তা ব্যবস্থার মাধ্যমে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার যে মডেল পাকিস্তান গড়ে তুলেছে, তা বাংলাদেশের জন্যও কার্যকর হতে পারে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ইতোমধ্যে পাকিস্তানের ইসলামাবাদ, লাহোর, মুলতান ও করাচিতে বাস্তবায়িত নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যক্রম সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন। সেই অভিজ্ঞতার আলোকে বাংলাদেশের বড় শহরগুলোতে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার সুযোগ রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্মার্ট নজরদারি, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং অপরাধ শনাক্তকরণ প্রযুক্তির ব্যবহার নগর নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতে পারে।
বৈঠকে মাদকদ্রব্য ও সাইকোট্রপিক উপাদানের অবৈধ পাচার প্রতিরোধে দুই দেশের মধ্যে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) গুরুত্ব তুলে ধরা হয়।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সীমান্ত ও সমাজকে মাদকমুক্ত রাখতে যৌথ উদ্যোগ এবং তথ্য বিনিময় কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। এ ধরনের সহযোগিতা আঞ্চলিক নিরাপত্তা জোরদারেও সহায়ক হবে।
পাকিস্তানে বসবাসরত বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নাগরিকদের বিভিন্ন প্রশাসনিক জটিলতার বিষয়টিও বৈঠকে আলোচিত হয়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রয়োজনীয় নথিপত্রের অভাবে অনেক বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত পরিবার জাতীয় পরিচয়পত্রসংক্রান্ত সুবিধা পেতে সমস্যায় পড়ছেন। ফলে তারা শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং অন্যান্য মৌলিক অধিকার ভোগে প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হচ্ছেন।
তিনি বিষয়টি মানবিক বিবেচনায় দ্রুত সমাধানের আহ্বান জানান।
রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আলোচনায় বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক পরিসরে পাকিস্তানের অব্যাহত সমর্থন কামনা করে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে বৈশ্বিক সহযোগিতা অপরিহার্য।
তিনি অতীতে বিভিন্ন মানবিক ইস্যুতে দুই দেশের সমন্বিত উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে ভবিষ্যতেও একই ধরনের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে বলে আশা প্রকাশ করেন।
বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ ও বাণিজ্য সম্প্রসারণ নিয়েও আলোচনা হয়। দীর্ঘ বিরতির পর ঢাকা-করাচি সরাসরি বিমান যোগাযোগ চালুর ফলে ব্যবসা-বাণিজ্য, পর্যটন এবং জনগণের পারস্পরিক যোগাযোগ বৃদ্ধির নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে মত দেন দুই দেশের প্রতিনিধিরা।
বৈঠকের শেষে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ মহসিন নাকভী বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে পাকিস্তান সফরের আমন্ত্রণ জানান। সালাহউদ্দিন আহমদ আমন্ত্রণ গ্রহণ করে সুবিধাজনক সময়ে সফরের আগ্রহ প্রকাশ করেন।
নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত এই বৈঠক বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে নিরাপত্তা, মাদক দমন, নগর ব্যবস্থাপনা এবং মানবিক ইস্যুতে সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র উন্মোচনের ইঙ্গিত দিয়েছে। বিশেষ করে পুলিশ আধুনিকীকরণ ও প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা ব্যবস্থার ক্ষেত্রে পারস্পরিক অভিজ্ঞতা বিনিময় ভবিষ্যতে দুই দেশের সম্পর্ককে আরও কার্যকর ও ফলপ্রসূ করতে পারে।
