শৈশবে বন্ধুত্ব তৈরি হয় অনেকটা স্বাভাবিকভাবেই। একই স্কুল, পাড়ার খেলার মাঠ কিংবা একই শিক্ষকের কাছে পড়তে গিয়ে প্রতিদিনই বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হয়। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জীবনের ব্যস্ততা বাড়ে, বদলে যায় অগ্রাধিকারও। ফলে কোনো ঝগড়া বা বিরোধ ছাড়াই অনেক সময় প্রিয় বন্ধুর সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ কমে আসে।
যুক্তরাষ্ট্রের কানসাস বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক জেফরি হলের ২০১৯ সালের একটি গবেষণা অনুযায়ী, পরিচিত মানুষ থেকে সাধারণ বন্ধু হতে প্রায় ৪০ থেকে ৬০ ঘণ্টা একসঙ্গে সময় কাটাতে হয়। ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্বের জন্য প্রয়োজন ৮০ থেকে ১০০ ঘণ্টা এবং সবচেয়ে কাছের বন্ধু হয়ে উঠতে ২০০ ঘণ্টার বেশি সময় লাগতে পারে।
প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে এতটা সময় বের করা অনেকের কাছেই কঠিন। চাকরি, পরিবার, সন্তান কিংবা অন্যান্য দায়িত্বের কারণে অবসর সময় সীমিত হয়ে যায়।
শৈশবে বন্ধুত্বে নানা ধরনের হিসাব-নিকাশ কম থাকে। বড় হওয়ার পর পরিস্থিতি বদলে যায়। একজনের কর্মস্থল ও সময়সূচি এক রকম, অন্যজন হয়তো সন্তান বা মা-বাবার দেখাশোনায় ব্যস্ত।
ফলে বন্ধুত্ব টিকিয়ে রাখতে দুজনকেই আলাদা করে সময় বের করতে হয়।
২০২২ সালে ‘কারেন্ট অপিনিয়ন ইন সাইকোলজি’তে প্রকাশিত একটি পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, প্রাপ্তবয়স্কদের বন্ধুত্ব ভেঙে যাওয়ার পেছনে ব্যক্তিগত, পারস্পরিক ও পরিস্থিতিগত বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে।
নতুন চাকরি, সন্তান কিংবা শহর পরিবর্তনের মতো জীবনের বড় পরিবর্তন অনেক সময় বন্ধুত্বে দূরত্ব তৈরি করে। অর্থাৎ সব বন্ধুত্বের বিচ্ছেদের পেছনে বিশ্বাসঘাতকতা বা কোনো বড় বিরোধ থাকা জরুরি নয়।
বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে দূরে থেকেও যোগাযোগ রাখা সহজ হয়েছে। জন্মদিনে শুভেচ্ছা জানানো, কোনো ছবিতে লাইক দেওয়া বা মাঝেমধ্যে বার্তা পাঠানোকে অনেকে বন্ধুত্ব বজায় রাখার অংশ মনে করেন।
তবে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ডিজিটাল যোগাযোগ আর গভীর ব্যক্তিগত সংযোগ এক বিষয় নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৫ সালের একটি প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতি ছয়জনের একজন একাকিত্বে ভোগেন।
২০০০ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত প্রকাশিত ৩৮টি গবেষণা নিয়ে ২০২৩ সালের একটি পর্যালোচনায় দেখা যায়, বন্ধুত্বের মান এবং একসঙ্গে সময় কাটানোর বিষয়টি মানুষের সামগ্রিক সুস্থতার সঙ্গে সম্পর্কিত। এমনকি একজন ঘনিষ্ঠ বন্ধুও শারীরিক ও মানসিক সুস্থতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।
আর ২০১০ সালে তিন লাখের বেশি মানুষের তথ্য নিয়ে করা একটি গবেষণায় শক্তিশালী সামাজিক সম্পর্কের সঙ্গে তুলনামূলক বেশি বেঁচে থাকার সম্ভাবনার সম্পর্ক পাওয়া যায়। সেখানে বন্ধুর সংখ্যা নয়, সম্পর্কের গভীরতাকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হয়েছে।
ভালো বন্ধুত্ব নিজে থেকেই টিকে থাকবে—এমন ধারণা সবসময় বাস্তবসম্মত নয়। নিয়মিত ফোন করা, দেখা করার সময় নির্ধারণ করা, মাসে অন্তত একবার একসঙ্গে সময় কাটানো কিংবা ব্যস্ততার মধ্যেও কয়েক মিনিট খোঁজ নেওয়ার মতো ছোট উদ্যোগ সম্পর্ককে ধরে রাখতে সাহায্য করতে পারে।
তবে সব বন্ধুত্ব যে সারা জীবন একইভাবে থাকবে, এমনটিও নয়। জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে মানুষের পথ আলাদা হতে পারে। কোনো একটি সময়ে পাশে থাকা মানুষের সঙ্গে পরে দূরত্ব তৈরি হলেও সেই সম্পর্কের গুরুত্ব কমে যায় না।
