যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসি অঙ্গরাজ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সময় বিরল এক ঘটনার মুখে পড়েছে কারা কর্তৃপক্ষ। ১৯৯৫ সালের একটি হত্যাকাণ্ডে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত নারী বন্দি ক্রিস্টা গেল পাইকের শরীরে বিষাক্ত ইনজেকশনের দুটি নির্ধারিত ডোজ প্রয়োগের পরও তার মৃত্যু হয়নি।
ঘটনার পর তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। বর্তমানে ৫০ বছর বয়সী ক্রিস্টা পাইক সেখানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এ ঘটনায় টেনেসির গভর্নর বিল লি চলতি বছরের জন্য অঙ্গরাজ্যে সব ধরনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর স্থগিত ঘোষণা করেছেন।
গত বুধবার সকাল ১০টায় ন্যাশভিলের রিভারবেন্ড ম্যাক্সিমাম সিকিউরিটি ইনস্টিটিউটে পাইকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কথা ছিল। টেনেসি অঙ্গরাজ্যে ২০০ বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে কোনো নারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের এটি প্রথম ঘটনা হওয়ার কথা ছিল।
তবে কার্যকরের প্রায় এক ঘণ্টা আগে ষষ্ঠ ইউএস সার্কিট আপিল আদালত পাইকের শৈশবের মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের বিষয়টি আদালতে যথাযথভাবে মূল্যায়িত হয়েছিল কি না, তা পর্যালোচনার জন্য এক ঘণ্টার স্থগিতাদেশ দেন। পরে রাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেলের আবেদনের পর মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট সেই স্থগিতাদেশ বাতিল করলে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের অনুমতি পায় কর্তৃপক্ষ।
সন্ধ্যা ৭টা ২৭ মিনিটে কার্যকর কক্ষের পর্দা সরানো হলে পাইককে একটি বিছানায় বা গ্যারানিতে বাঁধা অবস্থায় দেখা যায়। ওষুধ প্রয়োগের একপর্যায়ে তিনি সজাগ হয়ে মাথা উঁচু করেন এবং নিজের হাত অস্বাভাবিক লাগছে কি না, তা নিয়ে কারারক্ষীদের প্রশ্ন করেন।
রাত ৮টা ২৬ মিনিটে পেন্টোবার্বিটালের দ্বিতীয় ডোজ প্রয়োগ শেষ হলেও তিনি তখনও জীবিত ছিলেন। তার বিকট নাক ডাকার শব্দও শোনা যায়। পরে রাত ৮টা ৫৩ মিনিটে মাইকের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে সাংবাদিকদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের এলাকা থেকে চলে যেতে বলা হয়। এরপর গভীর রাতে তাকে অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে নেওয়া হয়।
ঘটনার পর পাইকের আইনজীবীরা জরুরি রিট আবেদন করেন। তাদের দাবি, অকার্যকরভাবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের এই চেষ্টা পাইককে চরম অমানবিক যন্ত্রণার মুখে ফেলেছে, যা মার্কিন সংবিধানে নিষ্ঠুর ও অস্বাভাবিক শাস্তির বিরুদ্ধে থাকা অধিকারের লঙ্ঘন।
আইনজীবীরা কারা কর্তৃপক্ষকে পাইকের জীবন রক্ষায় জরুরি চিকিৎসার ব্যবস্থা করার আহ্বান জানান।
টেনেসির গভর্নর বিল লি জানিয়েছেন, ঘটনাটি কীভাবে ঘটেছে তা বিস্তারিতভাবে খতিয়ে দেখতে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ পর্যালোচনা কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত চলতি বছরে টেনেসিতে আর কোনো মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হবে না বলে জানিয়েছেন তিনি।
গভর্নর বলেন, আইনসম্মত শাস্তি কার্যকর করা রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। তবে সেটি কার্যকর ও সাংবিধানিক নিয়ম মেনেই হতে হবে।
অন্যদিকে টেনেসির কারা বিভাগ দাবি করেছে, তারা রাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেলের অনুমোদিত আইনের প্রতিটি ধাপ অনুসরণ করেছে। তবে অঙ্গরাজ্যের নিয়মে দুই ডোজ ওষুধ প্রয়োগের পরও কোনো বন্দি জীবিত থাকলে কী করতে হবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা ছিল না।
১৯৯৫ সালের ১২ জানুয়ারি নক্সভিলের একটি জব ট্রেনিং সেন্টারের ১৮ বছর বয়সী শিক্ষার্থী ক্রিস্টা পাইক তার প্রেমিক ট্যাডরিস শিপকে নিয়ে ১৯ বছর বয়সী সহপাঠী কলিন স্লেমায়ারের ওপর হামলা চালান। প্রেমিককে ছিনিয়ে নেওয়ার সন্দেহে স্লেমায়ারকে একটি বনাঞ্চলে ডেকে নিয়ে বক্স কাটার দিয়ে আঘাত করা হয় এবং মাথায় পাথর দিয়ে আঘাত করে হত্যা করা হয়।
ঘটনার সময় পাইকের ১৭ বছর বয়সী প্রেমিক শিপ ভুক্তভোগীর শরীরে পেন্টাগ্রাম বা শয়তান পূজার প্রতীক খোদাই করে দেয়। এ ঘটনায় শিপকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হলেও পাইককে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
পরবর্তীতে পাইকের বাইপোলার ডিসঅর্ডার ও পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার শনাক্ত হয়। তার আইনজীবীরা দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছিলেন, অপরাধের সময় তার মানসিক অসুস্থতা, শৈশবের চরম নির্যাতন এবং মাত্র ১৮ বছর বয়সের বিষয়গুলো আদালতে যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি।
ডেথ পেনাল্টি ইনফরমেশন সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক রবিন এম মাহের ঘটনাটিকে অত্যন্ত বিরল বলে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, আগে চিকিৎসাগত জটিলতায় মৃত্যুদণ্ড স্থগিত হওয়ার ঘটনা ঘটলেও, ইনজেকশনের পুরো ডোজ শরীরে প্রবেশের পরও কোনো বন্দি বেঁচে থাকার ঘটনা আগে ঘটেনি।
সূত্র: সিএনএন
