বাংলাদেশ রেফারেন্স ইনস্টিটিউট ফর কেমিক্যাল মেজারমেন্টসের (বিআরআইসিএম) প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মালা খানের নিয়োগ নিয়ে গুরুতর আপত্তি তুলেছে অডিট অধিদপ্তর। অডিট প্রতিবেদনে তার নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা না থাকার বিষয়টি উঠে এসেছে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন খাতে ৪ কোটি ৬১ লাখ ৯৯ হাজার ৫৩১ টাকার আর্থিক অনিয়মের তথ্যও পাওয়া গেছে।
যুগান্তরের এক প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে কালের কণ্ঠ জানায়, প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ছাড়া নিয়োগের কারণে শুধু বেতন-ভাতা বাবদ সরকারের ১ কোটি ৫ লাখ টাকার বেশি আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে অডিটে উল্লেখ করা হয়েছে।
অডিট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা পদে নিয়োগের জন্য বিজ্ঞানে ডক্টরেট ডিগ্রির পাশাপাশি ডিগ্রি অর্জনের পর ১৪ বছরের গবেষণা অভিজ্ঞতা ও বিশেষ অবদানের শর্ত ছিল।
২০১৫ সালের ২৮ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত বাছাই কমিটির সভায় মালা খানের প্রয়োজনীয় গবেষণা অভিজ্ঞতা ও বিশেষ অবদানের প্রমাণ না থাকায় তার আবেদন বাতিলের সুপারিশ করা হয়েছিল। পরে জানা যায়, তিনি যে প্রতিষ্ঠান থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন, সেটি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুমোদিত নয়।
এরপরও তার আবেদন পুনর্বহাল করা হয়। ২০১৬ সালের ৩১ আগস্ট বিসিএসআইআরের ডিপিসি-১ তাকে তৎকালীন ডিআরআইসিএমের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা পদে সুপারিশ করে। তবে বিসিএসআইআর বোর্ডের ২৮৬তম সভায় সেই সুপারিশ নাকচ করা হয়।
বোর্ডের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ২০১৭ সালে হাইকোর্টে রিট করেন মালা খান। হাইকোর্ট তার পক্ষে রায় দিলে সরকার এর বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আবেদন করে। ২০১৭ সালের ২৩ আগস্ট আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায়ের কার্যকারিতা স্থগিত করেন।
তবে আট বছর পেরিয়ে গেলেও মামলাটির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, নিয়োগসংক্রান্ত অনিয়ম ও জালিয়াতির অভিযোগের তদন্তে প্রমাণ পাওয়ার পর ২০২৫ সালের ২৫ মে মালা খানকে সাময়িক বরখাস্ত করে মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটি। পরে তিনি আদালতের স্থগিতাদেশ নেন।
এ ছাড়া ২০২২ সালে একটি প্রকল্পের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে তদন্তে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর তাকে দ্বিতীয়বার বরখাস্ত করা হয়েছিল বলে বিআরআইসিএম সূত্র জানিয়েছে। ওই আদেশের বিরুদ্ধেও রিট করে স্থগিতাদেশ নেওয়া হয় বলে সূত্রটির দাবি।
ডাক, টেলিযোগাযোগ, বিজ্ঞান, তথ্য ও প্রযুক্তি অডিট অধিদপ্তরের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের কমপ্লায়েন্স অডিটে বিআরআইসিএমের বিরুদ্ধে মোট ১৩টি আপত্তি উত্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে ছয়টি গুরুতর আর্থিক অনিয়ম এবং সাতটি সাধারণ আর্থিক অনিয়ম।
অডিট প্রতিবেদনে বিভিন্ন খাতে আর্থিক অনিয়মের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে পারসোনাল লেজার খাত থেকে ব্যয় না দেখিয়ে ৪৪ লাখ ১৭ হাজার টাকা উত্তোলন, অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়া ৬২ লাখ ৩৪ হাজার টাকা ফেলোশিপ ভাতা হিসেবে ব্যয় এবং বিল থেকে বিধি অনুযায়ী আয়কর ও ভ্যাট কর্তন না করায় প্রায় ২১ লাখ টাকা ক্ষতির কথা বলা হয়েছে।
এ ছাড়া বাজেট বরাদ্দের শর্ত লঙ্ঘন করে বিল পরিশোধের মাধ্যমে ২ কোটি ৩৮ লাখ টাকা অনিয়মিত ব্যয়ের তথ্যও প্রতিবেদনে রয়েছে। সব মিলিয়ে বিভিন্ন খাতে সরকারের আর্থিক ক্ষতি ও অনিয়মিত ব্যয়ের পরিমাণ ৪ কোটি ৬১ লাখ ৯৯ হাজার ৫৩১ টাকা বলে অডিটে উল্লেখ করা হয়েছে।
এসব আপত্তির জবাব চেয়ে গত ১০ আগস্ট বিআরআইসিএমকে চিঠি দিয়েছে অডিট অধিদপ্তর।
বিআরআইসিএমের মহাপরিচালক মো. ইফতেখার আহমেদ চৌধুরী বলেন, অডিট আপত্তিগুলো অডিট দপ্তরের বিষয়। যেসব বিষয়ে জবাব চাওয়া হয়েছে, সেগুলোর তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করে জবাব দেওয়ার পর অডিট দপ্তর আবার যাচাই-বাছাই করবে। এরপর পর্যায়ক্রমে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মালা খানের মামলার বিষয়ে তিনি বলেন, বিষয়টি আদালতের অধীনে থাকায় এ মুহূর্তে মন্তব্য করার সুযোগ নেই। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের চিঠির জবাব এখনো দেওয়া হয়নি এবং জবাব তৈরির কাজ চলছে বলেও জানান তিনি।
অন্যদিকে, মালা খান তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো সত্য নয় বলে জানিয়েছেন। তিনি নিজের পক্ষে তথ্যপ্রমাণ দেওয়ার কথা বললেও প্রতিবেদকের সঙ্গে পরে আর যোগাযোগ করেননি।
এদিকে, মালা খানের অভিযোগের বিষয়ে গত ২১ এপ্রিল জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় বিআরআইসিএমকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য চিঠি দিয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
