কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলায় একটি বাজারের নামকরণকে কেন্দ্র করে দুই গ্রামের বাসিন্দাদের মধ্যে ফের সহিংস সংঘর্ষে মাসুদ মিয়া (৩০) নামে এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। সোমবার সকালে শুরু হওয়া এ সংঘর্ষে অন্তত ২৫ জন আহত হয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ মোতায়েন করা হলেও দুপুর পর্যন্ত থেমে থেমে সংঘর্ষ চলতে থাকে। এ ঘটনায় ভৈরব–ময়মনসিংহ রেলপথে ট্রেন চলাচলও সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সোমবার সকাল আটটার দিকে ভৈরব উপজেলার কালিকাপ্রসাদ ইউনিয়নের আকবরনগর ও মিরারচর গ্রামের বাসিন্দারা লাঠিসোঁটা নিয়ে গ্রামের মাঠে মুখোমুখি সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। সংঘর্ষে অন্তত ২৫ জন আহত হন। তাঁদের মধ্যে ১৭ জনকে ভৈরব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে।
নিহত মাসুদ মিয়া পেশায় একজন অটোরিকশাচালক এবং তিনি মিরারচর গ্রামের বাসিন্দা। ভৈরব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক উম্মে হাবিবা জানান, সকাল সাড়ে ৯টার দিকে তাঁকে হাসপাতালে আনা হলে চিকিৎসকেরা দেখতে পান, এর আগেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে। তাঁর শরীরে রক্তপাতের কোনো চিহ্ন ছিল না। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, মারধরের কারণে তাঁর মৃত্যু হয়েছে।
সংঘর্ষের কারণে সকাল ১০টা থেকে ভৈরব–ময়মনসিংহ রেলপথে ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে। ভৈরব স্টেশনের স্টেশনমাস্টার ইউসুফ জানান, সংঘর্ষে জড়িত ব্যক্তিরা রেললাইন ব্যবহার করায় যাত্রীদের নিরাপত্তার স্বার্থে ট্রেন চলাচল সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়েছে।
এর ফলে জামালপুর থেকে চট্টগ্রামগামী আন্তনগর বিজয় এক্সপ্রেস কুলিয়ারচর স্টেশনে এবং ঢাকা থেকে কিশোরগঞ্জগামী আন্তনগর এগারসিন্ধুর এক্সপ্রেস ভৈরব স্টেশনে আটকে রয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, আকবরনগর ও মিরারচর গ্রামের মাঝ দিয়ে ভৈরব–ময়মনসিংহ আঞ্চলিক মহাসড়ক নির্মাণের পর সেখানে একটি বাসস্ট্যান্ড গড়ে ওঠে। ১৯৯১ সালে বাসস্ট্যান্ডের দুই পাশে বাজার বসতে শুরু করে। দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয়ভাবে বাজারটি ‘আকবরনগর-মিরারচর বাজার’ নামে পরিচিত থাকলেও সরকারি নথিতে এর নির্দিষ্ট কোনো নাম ছিল না।
বিরোধের সূচনা হয় ২০২৩ সালের জুলাই মাসে। সে সময় সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে একটি সচেতনতামূলক সাইনবোর্ড স্থাপন করে, যেখানে বাজারের নাম শুধু ‘আকবরনগর বাজার’ লেখা হয়। এর প্রতিবাদে একই বছরের ৯ জুলাই মিরারচর গ্রামের কয়েকজন সাইনবোর্ডটি ভেঙে ফেলেন। ওই ঘটনার জেরে কয়েক দিন ধরে চলা সংঘর্ষে পাঁচ পুলিশ সদস্যসহ শতাধিক মানুষ আহত হন এবং বাজারের বহু দোকানপাট ভাঙচুর করা হয়।
স্থানীয়দের দাবি, প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতাদের উদ্যোগে তখনকার সংঘাত থেমে গেলেও দুই গ্রামের সামাজিক সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়নি। পরবর্তীতে বিভিন্ন বিরোধও বাজারের নামকরণের ইস্যুর সঙ্গে যুক্ত হয়ে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি করে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, কয়েক দিন আগে বাজারে দুই এলাকার কয়েকজনের মধ্যে কথা-কাটাকাটির ঘটনা ঘটে। এর জেরে আবারও উত্তেজনা বাড়তে থাকে। পরিস্থিতি সামাল দিতে রোববার স্থানীয় সংসদ সদস্য ও বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী শরিফুল আলম দুই গ্রামের প্রতিনিধিদের নিয়ে বৈঠক করেন। সেখানে উভয় পক্ষের ১০ জন করে প্রতিনিধিকে নিয়ে দ্রুত সভা করে বাজারের নাম চূড়ান্ত করার সিদ্ধান্ত হয়।
বৈঠকে উপস্থিত ভৈরব উপজেলা বিএনপির সভাপতি রফিকুল ইসলাম বলেন, “সভা না হওয়া পর্যন্ত কোনো পক্ষ সংঘাতে জড়াবে না বলে উভয় পক্ষের প্রতিনিধিরা অঙ্গীকার করেছিলেন। কিন্তু পরদিনই সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে গেছে।”
মিরারচর গ্রামের বাসিন্দাদের দাবি, বাজার গড়ে ওঠা ও পরিচিতি পাওয়ার ক্ষেত্রে তাঁদেরও সমান অবদান রয়েছে। তাই বাজারটির নাম ‘মিরারচর বাজার’ অথবা ‘আকবরনগর-মিরারচর বাজার’ রাখা উচিত।
অন্যদিকে আকবরনগর গ্রামের বাসিন্দাদের বক্তব্য, বাজার ও বাসস্ট্যান্ড সরকারি নথি অনুযায়ী আকবরনগর মৌজার মধ্যে অবস্থিত। সে কারণে ‘আকবরনগর বাজার’ নামটিই যথাযথ।
সড়ক ও জনপথ বিভাগের ভৈরব কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা, নাম প্রকাশ না করার শর্তে, জানান যে বাজারটি আকবরনগর মৌজার মধ্যে হওয়ায় নিয়ম অনুযায়ী সাইনবোর্ডে ওই নামই ব্যবহার করা হয়েছে। তবে একটি সাইনবোর্ডের নামকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিনের সংঘাত ও প্রাণহানির বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
এদিকে ঘটনাস্থলে দায়িত্ব পালনরত ভৈরব থানার উপপরিদর্শক (এসআই) এমদাদুল কবির বলেন, পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে। তবে দুপুর পর্যন্ত পুরো পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা সম্ভব হয়নি।
