মামলাপূর্ব বাধ্যতামূলক মধ্যস্থতা (প্রি-কেস মেডিয়েশন) কার্যক্রম আদালতে নতুন মামলা দায়ের উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে সক্ষম হয়েছে বলে জানিয়েছেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তাঁর মতে, এই উদ্যোগ আরও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে দেশের দীর্ঘদিনের মামলাজট নিরসনে বড় ধরনের অগ্রগতি সম্ভব হবে।
মঙ্গলবার রাজধানীর আইন মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষ থেকে ভার্চুয়ালি ১০টি জেলায় মামলাপূর্ব বাধ্যতামূলক মধ্যস্থতা কার্যক্রমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
আইনমন্ত্রী জানান, বর্তমানে দেশে প্রায় ৪৫ লাখ মামলা বিচারাধীন রয়েছে, যা বিচারব্যবস্থার ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করছে। আদালতে মামলা দায়েরের আগেই বিরোধ নিষ্পত্তির সুযোগ সৃষ্টি করা গেলে বিচারপ্রার্থীদের সময়, অর্থ ও দুর্ভোগ কমবে, একই সঙ্গে আদালতের ওপর চাপও হ্রাস পাবে।
তিনি বলেন, একটি পাইলট প্রকল্পের আওতায় ২০টি জেলায় প্রি-কেস মেডিয়েশন চালুর পর ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে মে সময়ের তুলনায় ২০২৬ সালের একই সময়ে বিভিন্ন আইনে নতুন মামলা দায়েরের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
তথ্য তুলে ধরে মন্ত্রী জানান, পারিবারিক আদালত আইনে মামলা ৩ হাজার ৫৫৯টি থেকে কমে ১ হাজার ৭৪৪টিতে নেমেছে, যা প্রায় ৫১ শতাংশ হ্রাস। বণ্টনসংক্রান্ত মামলার সংখ্যা ২ হাজার ১টি থেকে ৬৬১টিতে নেমে এসেছে, যা ৬৬ দশমিক ৯৭ শতাংশ কম।
এ ছাড়া স্টেট অ্যাকুইজিশন অ্যান্ড টেন্যান্সি আইনের প্রিম্পশন মামলা ১৭টি থেকে ২টিতে নেমে ৮৮ দশমিক ২৪ শতাংশ, নন-এগ্রিকালচারাল টেন্যান্সি আইনে ৩১টি থেকে ১৪টিতে নেমে ৫৪ দশমিক ৮৪ শতাংশ, যৌতুক নিরোধ আইনে ৫ হাজার ৬০৫টি থেকে ১ হাজার ৮১০টিতে নেমে ৬৭ দশমিক ৭১ শতাংশ এবং পিতামাতার ভরণ-পোষণ আইনে ৪৩টি থেকে ৩৫টিতে নেমে ১৮ দশমিক ৬০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। সব মিলিয়ে গড়ে মামলা দায়ের কমেছে ৬২ দশমিক ০২ শতাংশ।
মো. আসাদুজ্জামান বলেন, আদালতে নতুন মামলা প্রবাহ কমানো গেলে বিচারাধীন মামলার সংখ্যাও দ্রুত কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। পাশাপাশি বিচারকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বিচারাধীন যেসব মামলা আলোচনার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা সম্ভব, সেগুলো জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে মধ্যস্থতার জন্য পাঠানো হলে বিচারপ্রক্রিয়া আরও গতিশীল হবে।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, আদালত, জেলা লিগ্যাল এইড অফিস, আইনজীবী ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ সমন্বিতভাবে কাজ করলে আগামী এক বছরের মধ্যে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে আনা সম্ভব হতে পারে।
গণমাধ্যমের ভূমিকাও তুলে ধরে আইনমন্ত্রী বলেন, সরকারের অর্থায়নে পরিচালিত লিগ্যাল এইড কার্যক্রমের মাধ্যমে অসহায় ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী বিনামূল্যে আইনি সহায়তা ও দ্রুত ন্যায়বিচারের সুযোগ পাচ্ছে। এ বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
কক্সবাজার জেলায় বর্তমানে এক লাখের বেশি মামলা বিচারাধীন রয়েছে উল্লেখ করে তিনি সংশ্লিষ্ট বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা ও অংশীজনদের আগামী তিন মাসের মধ্যে মামলাজট দৃশ্যমানভাবে কমানোর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি জানান, আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর এ বিষয়ে অগ্রগতি মূল্যায়ন করা হবে।
প্রি-কেস মেডিয়েশন কার্যক্রম বাস্তবায়নে জাইকা, জিআইজেড এবং ইউএনডিপির সহযোগিতার প্রশংসা করে আইনমন্ত্রী তাদের ধন্যবাদ জানান। একই সঙ্গে মধ্যস্থতাকারীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, এ দায়িত্বকে শুধু চাকরি নয়, জনসেবার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। তবে মধ্যস্থতা কার্যক্রমে যেকোনো ধরনের দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথাও তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন।
বাংলাদেশ আইনগত সহায়তা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. মনজুর হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আইন ও বিচার বিভাগের সচিব লিয়াকত আলী মোল্লা বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন। এছাড়া ভার্চুয়ালি বক্তব্য রাখেন যশোরের জেলা ও দায়রা জজ মাহমুদা খাতুন, কক্সবাজারের চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আবু সালেহ মোহাম্মদ নোমান, জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার অভিজিৎ চৌধুরী এবং জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আবদুল মান্নান।
অনুষ্ঠানের শেষে আইনমন্ত্রী বগুড়া, ঠাকুরগাঁও, পটুয়াখালী, ভোলা, নাটোর, যশোর, শরীয়তপুর, কক্সবাজার, পঞ্চগড় ও টাঙ্গাইল—এই ১০ জেলায় একযোগে মামলাপূর্ব বাধ্যতামূলক মধ্যস্থতা কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন।
আইনগত সহায়তা প্রদান (সংশোধন) আইন, ২০২৬-এর ধারা ২১খ অনুযায়ী চালু হওয়া এ ব্যবস্থার আওতায় উল্লিখিত জেলাগুলোতে সাতটি নির্দিষ্ট আইনের ক্ষেত্রে আদালতে মামলা করার আগে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের মাধ্যমে মধ্যস্থতার উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
