যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশের স্ত্রী ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী নাহিদ সুলতানা যুথির বিরুদ্ধে সংগঠনের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার, পদ বাণিজ্য, কমিটি গঠন আটকে রাখা, আর্থিক অনিয়ম এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের নানা অভিযোগ উঠেছে। যুবলীগের একাধিক বর্তমান ও সাবেক নেতার দাবি, সংগঠনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তাঁর প্রভাব ছিল এবং দীর্ঘ সময় ধরে তিনি একটি আলাদা ক্ষমতার বলয় গড়ে তোলেন।
বিভিন্ন নেতা-কর্মী ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের বক্তব্য অনুযায়ী, যুথি শুধু আদালতপাড়ার আইনজীবী হিসেবেই নয়, যুবলীগের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডেও সক্রিয় প্রভাব বিস্তার করতেন। অভিযোগ রয়েছে, সংগঠনের বিভিন্ন পদ, কমিটি গঠন এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে তাঁর মতামত কার্যত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল।
যুবলীগের একাধিক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করেন, সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের কমিটি গঠন দীর্ঘদিন আটকে ছিল। তাঁদের দাবি, পদপ্রত্যাশীদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার অভিযোগের কারণে অনেক জেলায় সময়মতো সম্মেলন ও নতুন কমিটি গঠন সম্ভব হয়নি।
তাঁদের ভাষ্য, বিভিন্ন পদে মনোনয়ন বা কমিটিতে অন্তর্ভুক্তির আশ্বাস দিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ নেওয়ার অভিযোগ ছিল। অনেক ক্ষেত্রে অর্থ নেওয়ার পরও প্রতিশ্রুত পদ দেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ করেন তাঁরা।
নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুথি বিভিন্ন সময় মন্তব্য করেছিলেন, “আমাকেই সব করতে হবে। কারণ সে (পরশ) কখনো নিজে কিছু (দুর্নীতি) করবে না।”
যুবলীগের কয়েকজন নেতা-কর্মীর দাবি, দলীয় কার্যালয়ে তাঁর জন্য আলাদা একটি ফ্লোর ব্যবহৃত হতো এবং তাঁর অনুমতি ছাড়া অনেকেই চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারতেন না।
অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠান, বার কাউন্সিলের কার্যক্রম কিংবা ব্যক্তিগত আয়োজনেও সংগঠনের নেতা-কর্মীদের দিয়ে নানা ধরনের সহযোগিতা নেওয়া হতো। এসব বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
বিভিন্ন সূত্র জানায়, বহু জেলায় দীর্ঘ সময় নতুন কমিটি গঠন না হওয়ায় সংগঠনের কার্যক্রমে স্থবিরতা তৈরি হয়। এ কারণে অনেক অভিজ্ঞ নেতা আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ে যোগ দেন, কেউ বিদেশে চলে যান, আবার কেউ রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ান।
যুবলীগের কয়েকজন নেতার অভিযোগ, কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হলেই তা নানাভাবে বিলম্বিত করা হতো।
২০২৪-২৫ মেয়াদের বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সম্পাদক পদে নির্বাচনের সময়ও নাহিদ সুলতানা যুথিকে ঘিরে বিতর্ক সৃষ্টি হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আওয়ামী আইনজীবী পরিষদের মনোনয়ন না পেয়ে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, নির্বাচনের সময় কিছু যুবলীগ নেতা-কর্মীকে তাঁর পক্ষে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। একই সঙ্গে নির্বাচনী পরিবেশকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, হামলা ও বিশৃঙ্খলার ঘটনাও ঘটে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৪ সালের ৮ মার্চ ভোট গণনাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের ঘটনায় রাজধানীর শাহবাগ থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়। সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল সাইফুর রহমান চৌধুরী সাইফ বাদী হয়ে হত্যা চেষ্টার অভিযোগে মামলাটি করেন।
পরে ওই বছরের ১২ মে নাহিদ সুলতানা যুথি ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আত্মসমর্পণ করে মুচলেকার মাধ্যমে জামিন লাভ করেন।
প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, সরকার পরিবর্তনের পর নাহিদ সুলতানা যুথি বর্তমানে তাঁর স্বামী, যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশের সঙ্গে কানাডায় অবস্থান করছেন।
যুবলীগের বিভিন্ন নেতা-কর্মীর অভিযোগ, সংগঠনে তাঁর প্রভাব, ক্ষমতার ব্যবহার এবং আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় ছিল। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে নাহিদ সুলতানা যুথি বা শেখ ফজলে শামস পরশের কোনো বক্তব্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
