রাশিয়ায় জনপ্রিয় হয়ে ওঠা ‘ম্যাক্স’ নামের একটি সুপার অ্যাপ নিয়ে নজরদারির অভিযোগ উঠেছে। সাম্প্রতিক এক ফরেনসিক গবেষণায় দাবি করা হয়েছে, অ্যাপটি ব্যবহারকারীদের অজান্তে ফোনের স্ক্রিনশট নিতে, মিনি অ্যাপের তথ্য সংগ্রহ করতে এবং বার্তা ও আর্থিক লেনদেনের তথ্যের মতো সংবেদনশীল ডেটায় প্রবেশ করতে সক্ষম।
‘ম্যাক্স’ রাশিয়ার নিজস্ব একটি সুপার অ্যাপ। এতে বার্তা আদান–প্রদান, ব্যাংকিংসহ বিভিন্ন সেবা এবং সরকারি সেবার জন্য একাধিক মিনি অ্যাপ যুক্ত করা হয়েছে। অ্যাপটি তৈরি করেছে রাশিয়ার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রতিষ্ঠান ‘ভিকোনতাকতে’, যেটি দেশটির সরকারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত দেড় বছরে রাশিয়ার কয়েক কোটি মানুষকে মোবাইল ফোনে ম্যাক্স ইনস্টল করতে বাধ্য করা হয়েছে। রুশ কর্তৃপক্ষ এটিকে টেলিগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপের ‘দেশপ্রেমিক বিকল্প’ হিসেবে প্রচার করেছে। চলতি গ্রীষ্মে এটি দেশটির সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত বার্তা আদান–প্রদানের অ্যাপে পরিণত হয়।
সরকারি প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন খাতে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী-শিক্ষক এবং স্কুলের শিক্ষার্থীদেরও ম্যাক্স ব্যবহারে চাপ দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্সের সহযোগী অধ্যাপক রয়া এনসাফির নেতৃত্বাধীন গবেষক দল রাশিয়ায় ব্যবহৃত ম্যাক্সের একটি সংস্করণ পরীক্ষা করে। তাঁদের দাবি, অ্যাপটি ব্যবহারকারীর অজান্তে ডিভাইসের স্ক্রিনশট এবং মিনি অ্যাপগুলোর তথ্যের ছবি তুলতে পারে। একই সঙ্গে এসব মিনি অ্যাপে থাকা তথ্য, বার্তা ও আর্থিক লেনদেনের হিসাবেও প্রবেশের সক্ষমতা রয়েছে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, ম্যাক্সের মিনি অ্যাপগুলোর মধ্যে ক্ষতিকর কোড ঢোকানোর সুযোগ রয়েছে। রয়া এনসাফির মতে, এর ফলে অ্যাপটি ব্যবহার করে সাইবার হামলা চালানোর সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে।
তবে গবেষণায় একটি সীমাবদ্ধতার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। ফোনে টেলিগ্রাম বা হোয়াটসঅ্যাপ ইনস্টল থাকলে ম্যাক্স সরাসরি ওই দুটি অ্যাপে প্রবেশ করতে পারে না বলে এনসাফি জানিয়েছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাশিয়া ইতিমধ্যে এই দুটি অ্যাপ নিষিদ্ধ করেছে।
মস্কোর এক স্কুলশিক্ষক জানান, নগর কর্তৃপক্ষের নির্দেশের পর তাঁদের স্কুলের সব শিক্ষক-কর্মচারীর যোগাযোগ ম্যাক্সে স্থানান্তরের নির্দেশ দেওয়া হয়। অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগ, বাড়ির কাজ পাঠানোসহ স্কুলের অন্যান্য যোগাযোগও এই অ্যাপের মাধ্যমে করার কথা বলা হয়েছিল।
সেন্ট পিটার্সবার্গের বিশ্ববিদ্যালয়শিক্ষার্থী দানিল জানান, শিক্ষাবর্ষ শুরুর আগে তাঁকে ম্যাক্স ডাউনলোড করতে বাধ্য করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবন বা হলে প্রবেশের জন্য ম্যাক্সে তৈরি কিউআর কোড প্রয়োজন হবে বলেও তাঁকে জানানো হয়েছিল।
মস্কোর বাসিন্দা নিকোলাইও অ্যাপটির গোপনীয়তা নিয়ে উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, ম্যাক্স ব্যবহারের সময় তিনি জানেন না কে বা কারা তাঁকে নজরদারি করছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ম্যাক্স দ্রুত ছড়িয়ে পড়লেও রাশিয়ার মানুষের কাছে সংবাদ ও মতামত পৌঁছানোর প্রধান মাধ্যম হিসেবে এটি এখনো টেলিগ্রামের জায়গা নিতে পারেনি। গণমাধ্যম, ব্লগার ও সরকারি কর্মকর্তাদের ব্যবহৃত পাবলিক চ্যানেলগুলো ম্যাক্সে এখনো তেমন উন্নত নয়।
অন্যদিকে, কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি ও ব্যবসায়ীর দাবি, রাশিয়ার অভিজাত শ্রেণির অনেকে ম্যাক্স ব্যবহার করলেও দৈনন্দিন যোগাযোগের জন্য এখনো টেলিগ্রাম ও সিগন্যাল ব্যবহার করছেন।
রয়া এনসাফি মনে করেন, ম্যাক্সকে দ্রুত ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাটি ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে একটি সতর্কবার্তা। তাঁর মতে, রাশিয়ায় ইন্টারনেট ব্যবহারের ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ দ্রুত বেড়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ম্যাক্স ও ‘ভিকোনতাকতে’র সঙ্গে যোগাযোগ করে এসব বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাওয়া হলেও তাদের পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
