রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের সম্ভাব্য পদত্যাগ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে বঙ্গভবনের অধস্তন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের শিগগিরই সরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। একই সঙ্গে দায়িত্ব ছাড়ার পর রাষ্ট্রপতি বিশ্রাম ও চিকিৎসার জন্য বিদেশে যেতে পারেন বলেও জানা গেছে।
বঙ্গভবন-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা না এলেও সাম্প্রতিক সময়ে এ নিয়ে আলোচনা জোরালো হয়েছে। বিষয়টি নতুন মাত্রা পায় অনুসন্ধানী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের সামির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টের পর। তবে সরকার, বিএনপি বা বঙ্গভবনের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেওয়া হয়নি।
বঙ্গভবনের এক কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় প্রায়ই নিজের শারীরিক অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলতেন, “শরীরটা ভালো যাচ্ছে না, যেকোনো সময় যেকোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে নিতে পারি।” সংশ্লিষ্ট সূত্রের মতে, পদত্যাগ করলে তিনি চিকিৎসা ও বিশ্রামকে অগ্রাধিকার দিতে চান।
চলতি বছরের মে মাসে স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য যুক্তরাজ্য সফরে যান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। এর আগে ২০২৩ সালের অক্টোবরে সিঙ্গাপুরে তার হৃদযন্ত্রে বাইপাস অস্ত্রোপচার করা হয়েছিল। ফলোআপ চিকিৎসার অংশ হিসেবে যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজে রয়াল প্যাপওয়ার্থ হাসপাতালে তার এনজিওগ্রাম করা হয়।
গত ১২ মে পরীক্ষার সময় হৃদযন্ত্রের একটি ধমনিতে গুরুতর ব্লক ধরা পড়লে তাৎক্ষণিকভাবে এনজিওপ্লাস্টি করে স্টেন্ট বসানো হয়। কয়েকদিন চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে থাকার পর তিনি দেশে ফেরেন। সে সময় বঙ্গভবনের প্রেস বিভাগ জানিয়েছিল, তার শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল ও সন্তোষজনক।
চিকিৎসাধীন অবস্থাতেও রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব পালন অব্যাহত রাখেন। যুক্তরাজ্যে অবস্থানকালেই তিনি বিভিন্ন সরকারি নথিতে ডিজিটাল অনুমোদন দেন এবং সুদানের প্রধানমন্ত্রী কামিল ইদ্রিসের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। দেশে ফিরে ১৫ জুলাই ‘জুলাই শহীদ দিবস’ উপলক্ষে জাতির উদ্দেশে বাণীও দেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক মালয়েশিয়া ও চীন সফরের পর রাষ্ট্রপতির সঙ্গে তার কোনো সৌজন্য সাক্ষাৎ হয়েছে কি না, সে বিষয়ে কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। সাধারণত বিদেশ সফর শেষে প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এ বিষয়ে তথ্য না আসায় রাজনৈতিক মহলের একাংশে রাষ্ট্রপতি ও সরকারের সম্পর্ক নিয়ে নানা জল্পনা তৈরি হয়েছে।
রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের প্রসঙ্গ অবশ্য নতুন নয়। ২০২৫ সালের ১১ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি দায়িত্ব ছাড়ার আগ্রহের কথা জানিয়েছিলেন। তখন তিনি বলেছিলেন, “আমি বিদায় নিতে আগ্রহী। আমি এখান থেকে চলে যেতে চাই।” কারণ জানতে চাইলে তার জবাব ছিল, “আমার ভালো লাগে না।”
ওই সাক্ষাৎকারে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নিজেকে কোণঠাসা মনে হওয়ার কথাও উল্লেখ করেছিলেন তিনি। তবে ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের পর বিএনপি সরকার গঠন করলেও তিনি পদত্যাগ করেননি। পরবর্তীতে রাষ্ট্রপতির কাছেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যরা শপথ নেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট জাতির উদ্দেশে ভাষণে শেখ হাসিনার পদত্যাগপত্র গ্রহণের কথা বললেও একই বছরের ১৯ অক্টোবর দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রপতি বলেন, তার কাছে এ বিষয়ে কোনো দালিলিক প্রমাণ নেই। পরস্পরবিরোধী এই বক্তব্যকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক বিতর্কের সৃষ্টি হয় এবং বিভিন্ন সংগঠন তার পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন করে।
এ ছাড়া চলতি বছরের ১২ মার্চ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণ শুরুর পর জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ কয়েকটি বিরোধী দলের সদস্যরা ওয়াকআউট করেন। জুলাই অভ্যুত্থান এবং শেখ হাসিনার পদত্যাগসংক্রান্ত বক্তব্যের প্রতিবাদে তারা এ কর্মসূচি পালন করেন।
সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি স্পিকারের উদ্দেশে স্বাক্ষরযুক্ত পত্র পাঠিয়ে পদত্যাগ করতে পারেন। রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী স্পিকার দায়িত্ব পালন করবেন। বর্তমানে স্পিকারের দায়িত্বে রয়েছেন হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
এ ছাড়া ১২৩(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, মৃত্যু, পদত্যাগ বা অপসারণের কারণে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হবে। সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন এবং বর্তমান সংসদে বিএনপির সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রে দলটির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হবে।
উল্লেখ্য, আওয়ামী লীগের মনোনয়নে ২০২৩ সালে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন মো. সাহাবুদ্দিন। একই বছরের ২৪ এপ্রিল তিনি শপথ নেন। পদত্যাগ না করলে তার মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ২০২৮ সালের এপ্রিলে।
