শাহজালাল বিমানবন্দরে নজিরবিহীন ঘটনায় যাত্রী ভোগান্তি; নিরাপত্তা প্রটোকল লঙ্ঘনের আশঙ্কা
ঢাকা: রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে চট্টগ্রামগামী একটি অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট উড্ডয়নের ঠিক আগে ব্যক্তিগত কারণে ফিরিয়ে আনার অভিযোগে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, একটি বেসরকারি এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটে থাকা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের এক কর্মকর্তা নিজের বিয়ের অনুষ্ঠানে ব্যবহারের শেরওয়ানি বাসায় ফেলে আসার বিষয়টি জানিয়ে বিমান থেকে নামতে চান। পরে তার অনুরোধ ও প্রভাবের কারণে ফ্লাইটটি ট্যাক্সিওয়ে থেকে পুনরায় টার্মিনালে ফিরিয়ে আনা হয়। এতে প্রায় ১০০ যাত্রী দীর্ঘ সময় ভোগান্তিতে পড়েন এবং ফ্লাইটটি কয়েক ঘণ্টা বিলম্বে গন্তব্যের উদ্দেশে যাত্রা করে।
ঘটনাটি শুক্রবার সকালে ঘটে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। নির্ধারিত সময় অনুযায়ী ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশে ফ্লাইটটির উড্ডয়নের প্রস্তুতি প্রায় শেষ হয়েছিল। যাত্রীরা আসন গ্রহণ করেন, নিরাপত্তা নির্দেশনাও সম্পন্ন হয়। ঠিক সেই সময় এক যাত্রী বিমান থেকে নামার অনুরোধ জানান।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ওই যাত্রী নিজেকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একজন ফার্স্ট অফিসার হিসেবে পরিচয় দেন এবং নিজের পরিচয়পত্র প্রদর্শন করেন। প্রথমে নিয়ম অনুযায়ী বিমান না থামানোর কথা জানানো হলেও পরে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে। একপর্যায়ে বিমানটি ট্যাক্সিওয়ে থেকে ফিরে আসে এবং যাত্রীকে নামার সুযোগ দেওয়া হয়।
জানা গেছে, ওই কর্মকর্তা পরিবারের সদস্যদের নিয়ে চট্টগ্রামে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে যাচ্ছিলেন। তবে তাড়াহুড়োর মধ্যে তিনি অনুষ্ঠানের জন্য প্রয়োজনীয় শেরওয়ানি বাসায় ফেলে আসেন। বিষয়টি বুঝতে পেরে তিনি ফ্লাইট থেকে নামার সিদ্ধান্ত নেন।
এর ফলে যাত্রীদের দীর্ঘ সময় বিমানবন্দরে অপেক্ষা করতে হয়। পরে প্রয়োজনীয় পোশাক নিয়ে পুনরায় বিমানবন্দরে ফেরার পর ফ্লাইটটি দুপুরের দিকে চট্টগ্রামের উদ্দেশে যাত্রা করে। যাত্রীদের অভিযোগ, বিলম্বের সময় তাদের জন্য পর্যাপ্ত খাবার বা পানীয়ের ব্যবস্থাও করা হয়নি।
অ্যাভিয়েশন খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল নীতিমালা অনুযায়ী গুরুতর চিকিৎসাজনিত জরুরি অবস্থা, নিরাপত্তা ঝুঁকি, যান্ত্রিক ত্রুটি বা এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলের নির্দেশ ছাড়া উড্ডয়নের প্রস্তুতিপর্বে থাকা কোনো বাণিজ্যিক বিমান ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত ব্যতিক্রমী ঘটনা।
তাদের মতে, কোনো যাত্রী মাঝপথে নেমে গেলে নিরাপত্তার স্বার্থে তার লাগেজ পুনরায় পরীক্ষা, যাত্রী তালিকা হালনাগাদ এবং একাধিক নিরাপত্তা প্রক্রিয়া অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক। ফলে এমন সিদ্ধান্ত কেবল যাত্রী ভোগান্তিই নয়, বিমান পরিচালনার নিরাপত্তা ব্যবস্থাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে।
অ্যাভিয়েশন বিশ্লেষক কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, ব্যক্তিগত প্রয়োজনের কারণে কোনো যাত্রীর জন্য ফ্লাইট ফিরিয়ে আনা আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল ব্যবস্থার স্বাভাবিক চর্চার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তিনি বলেন, এ ধরনের ঘটনায় অপারেশনাল সিদ্ধান্ত, নিরাপত্তা মানদণ্ড এবং পেশাগত নৈতিকতা—সবকিছুই মূল্যায়নের প্রয়োজন রয়েছে।
তার মতে, যদি কোনো কর্মকর্তা নিজের পরিচয় বা পদমর্যাদার প্রভাব ব্যবহার করে থাকেন, তবে বিষয়টি নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা উচিত।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া এবং নিরাপত্তা প্রটোকল অনুসরণ করা হয়েছে কি না—তা তদন্ত করে দেখা হবে।
মন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা বলেছেন, যাত্রীদের স্বার্থবিরোধী বা নিয়মবহির্ভূত কোনো কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া হবে না। তদন্ত শেষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ফ্লাইটের একাধিক যাত্রী জানিয়েছেন, নির্ধারিত সময় অনুযায়ী চট্টগ্রামে পৌঁছানোর পরিকল্পনা থাকলেও কয়েক ঘণ্টার বিলম্বের কারণে তাদের ব্যক্তিগত ও পেশাগত কাজে বিঘ্ন ঘটে। কেউ কেউ আর্থিক ক্ষতির কথাও উল্লেখ করেছেন।
এক যাত্রী বলেন, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজে অংশ নেওয়ার জন্য তিনি ভ্রমণের পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু ফ্লাইট বিলম্বের কারণে সেই সুযোগ হারাতে হয়েছে। তিনি ক্ষতিপূরণের বিষয়টিও বিবেচনার দাবি জানান।
ঘটনার পর বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স এবং সংশ্লিষ্ট বেসরকারি এয়ারলাইন্স—দুই প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে ফ্লাইট পরিচালনায় দায়িত্বপ্রাপ্ত পাইলট কী কারণে বিমান ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন এবং তা প্রচলিত নিয়মের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল কি না, সেটি তদন্তের অন্যতম বিষয় হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ঘটে যাওয়া এই ঘটনা দেশের বিমান পরিবহন খাতে নিরাপত্তা, পেশাদারিত্ব এবং জবাবদিহিতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন এবং দায় নির্ধারণের ওপরই নির্ভর করছে যাত্রীদের আস্থা পুনরুদ্ধার ও ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধের কার্যকর পদক্ষেপ।
