মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় ব্যয় সংকোচন নীতি, জারি হলো অর্থ বিভাগের পরিপত্র
রাষ্ট্রীয় ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং সীমিত সম্পদের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে সরকারি অর্থায়নে বিদেশ ভ্রমণ, নতুন যানবাহন ক্রয় এবং বিভিন্ন অবকাঠামোগত খাতে ব্যয় সীমিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য জারি করা নতুন নির্দেশনায় সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যয় ব্যবস্থাপনায় কঠোরতা আরোপ করা হয়েছে।
বুধবার (৮ জুলাই) অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ এ-সংক্রান্ত একটি পরিপত্র জারি করে। এতে বলা হয়েছে, সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, মূল্যস্ফীতির চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং সরকারি অর্থের সাশ্রয়ী ব্যবহার নিশ্চিত করাই এ সিদ্ধান্তের মূল উদ্দেশ্য।
পরিপত্র অনুযায়ী, পরিচালন বাজেটের আওতায় সব ধরনের থোক বরাদ্দ থেকে ব্যয় আপাতত বন্ধ থাকবে। একই সঙ্গে সরকারি প্রতিষ্ঠানের জন্য মোটরযান, জলযান ও আকাশযান ক্রয়ের ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
তবে ১০ বছরের বেশি পুরোনো অনুমোদিত সরকারি যানবাহন প্রতিস্থাপন এবং নতুন প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় যানবাহন অর্থ বিভাগের পূর্বানুমোদন সাপেক্ষে কেনা যাবে। নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, অ্যাম্বুলেন্স ও নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট যানবাহন ছাড়া নতুন ক্রয়কৃত সরকারি গাড়ি অবশ্যই বৈদ্যুতিকচালিত হতে হবে।
সরকারি পরিচালন বাজেট থেকে নতুন আবাসিক ও অনাবাসিক ভবন নির্মাণের ব্যয়ও স্থগিত করা হয়েছে। তবে যেসব প্রকল্পের নির্মাণকাজ ইতোমধ্যে ৭০ শতাংশ বা তার বেশি সম্পন্ন হয়েছে, সেগুলো বিশেষ অনুমোদনের ভিত্তিতে চালিয়ে নেওয়া যাবে।
এ ছাড়া ভূমি অধিগ্রহণ খাতে নতুন ব্যয়ও আপাতত বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সরকারি কর্মচারীদের গাড়ি কেনার জন্য সুদমুক্ত বিশেষ ঋণ বা অগ্রিম সুবিধাও স্থগিত করা হয়েছে।
উন্নয়ন বাজেটের আওতায় নতুন মোটরযান, জলযান ও আকাশযান কেনার ক্ষেত্রেও একই ধরনের বিধিনিষেধ কার্যকর থাকবে। তবে পরিপত্র জারির আগে অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর ক্ষেত্রে বিশেষ বিবেচনার সুযোগ রাখা হয়েছে।
অর্থ বিভাগ বলছে, উন্নয়ন ব্যয়কে অধিকতর ফলপ্রসূ ও প্রয়োজনভিত্তিক করার লক্ষ্যেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
সরকারি অর্থায়নে বিদেশে প্রশিক্ষণ, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম এবং কর্মশালায় অংশগ্রহণও সীমিত করা হয়েছে। তবে বিদেশি সরকার, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা, বিশ্ববিদ্যালয় বা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নে পরিচালিত বৃত্তি, ফেলোশিপ এবং উচ্চশিক্ষা কার্যক্রম এ বিধিনিষেধের আওতার বাইরে থাকবে।
এ ছাড়া বিদেশি অর্থায়নে আয়োজিত প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সক্ষমতা উন্নয়ন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের সুযোগ বহাল থাকবে।
পণ্য আমদানির আগে বাধ্যতামূলক পরিদর্শন বা জটিল প্রযুক্তিগত যন্ত্রপাতির গ্রহণযোগ্যতা পরীক্ষার প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের অনুমতি দেওয়া হতে পারে। তবে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সনদপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এসব কার্যক্রম সম্পন্ন করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।
বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, মূল্যস্ফীতির চাপ এবং সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তার প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন দেশ ব্যয় সংকোচনমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। বাংলাদেশের নতুন এই নির্দেশনাও সরকারি ব্যয়কে অগ্রাধিকারভিত্তিক খাতে সীমাবদ্ধ রাখার বৃহত্তর কৌশলের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ব্যয় নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে আর্থিক শৃঙ্খলা জোরদার করা সম্ভব হলেও উন্নয়ন কার্যক্রমের গতি যাতে ব্যাহত না হয়, সেদিকেও সমান নজর দেওয়া প্রয়োজন।
সরকারের নতুন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ নীতিতে বিদেশ সফর, যানবাহন ক্রয়, ভবন নির্মাণ ও ভূমি অধিগ্রহণসহ বিভিন্ন খাতে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সরকারি ব্যয়ের দক্ষ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে এ উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
