নীলফামারীর সৈয়দপুর রেলওয়ে কলোনির শতবর্ষী ৩৩টি গাছ কাটার সিদ্ধান্ত ঘিরে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট বন বিভাগের দাবি, জননিরাপত্তার ঝুঁকির কারণে গাছগুলোকে কর্তনযোগ্য বলা হয়েছিল। তবে সরকারি নথিতে দেখা গেছে, গাছগুলোর পরিপক্বতা, আর্থিক মূল্য, ব্যবহারযোগ্যতা ও পরিবেশগত গুরুত্ব বিবেচনায় সেগুলো কাটার সুপারিশ করা হয়েছিল। ব্যাপক সমালোচনার মুখে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় শেষ পর্যন্ত গাছ কাটার সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে।
নীলফামারীর সৈয়দপুর রেলওয়ে কলোনির শতবর্ষী ৩৩টি গাছ কাটার প্রক্রিয়া নিয়ে সরকারি নথি ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বক্তব্যের মধ্যে অসামঞ্জস্যের অভিযোগ উঠেছে। শুরুতে গাছগুলো জননিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে দাবি করা হলেও সরকারি নথিতে মূল বিবেচনা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে গাছের পরিপক্বতা, আর্থিক মূল্য, ব্যবহারযোগ্যতা এবং পরিবেশগত গুরুত্ব।
গত ১১ জুন রংপুর সামাজিক বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা নুরুল ইসলাম ৩৩টি গাছ কর্তনের বিষয়ে একটি নথিতে স্বাক্ষর করেন। এর আগের দিন সৈয়দপুর উপজেলার সামাজিক বনায়ন, নার্সারি ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. শাহিনুল ইসলাম মুজকুরি গাছগুলোর মূল্য নির্ধারণ করে প্রতিবেদন জমা দেন।
সেই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে নুরুল ইসলাম স্বাক্ষরিত নথিতে উল্লেখ করা হয়, মূল্যায়নকারী কর্মকর্তা গাছগুলোকে “পরিপক্বতা, আর্থিক/ব্যবহার উপযোগিতা ও পরিবেশগত গুরুত্ব বিবেচনায় কর্তনযোগ্য” হিসেবে মত দিয়েছেন এবং তিনি ওই মতের সঙ্গে একমত। একই সঙ্গে গাছ কেটে পরিবহনের ক্ষেত্রে বনজদ্রব্য পরিবহন (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা অনুসরণের নির্দেশও দেওয়া হয়।
তবে পরে নুরুল ইসলাম দাবি করেন, তিনি গাছ কাটার অনুমোদন দেননি; শুধু গাছগুলোকে কর্তনযোগ্য হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, “এসব গাছ পড়ে দেয়াল ভেঙে যাচ্ছে, বাড়িঘরের ক্ষতি হচ্ছে। তাই এগুলোকে কর্তনযোগ্য বলেছি, কাটার অনুমোদন দিইনি।”
তবে অনুমোদন না দিয়ে থাকলে গাছের মূল্য নির্ধারণ এবং কাটা গাছ পরিবহনের বিধিমালা অনুসরণের নির্দেশ কেন দেওয়া হয়েছিল—এ বিষয়ে তিনি কোনো ব্যাখ্যা দেননি।
অনুমোদনের তালিকায় থাকা ৩৩টি গাছের বাজারমূল্য নির্ধারণ করা হয় ৬ লাখ ১৫ হাজার ৩৯৬ টাকা। তালিকায় ছিল ৩টি রেইনট্রি, ৫টি কাঁঠাল, ২টি শেওড়া, ১টি নিম, ১২টি ইউক্যালিপটাস, ২টি মেহগনি, ৫টি আম, ১টি বট, ১টি কৃষ্ণচূড়া এবং ১টি ডেওয়া গাছ।
রংপুর সামাজিক বন বিভাগের তালিকায় এসব গাছের মধ্যে ছয়টিকে জীবিত গাছ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
সম্প্রতি গাছগুলো পরিদর্শন করেন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তুহিন ওয়াদুদ। তাঁর মতে, যেসব গাছ কাটার অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল, সেগুলোর বেশির ভাগই ক্ষতিকর বলে মনে হয়নি। তিনি বলেন, কয়েকটি মৃত গাছ সরানো যেতে পারে, তবে শতবর্ষী গাছগুলোর ভবিষ্যৎ নির্ধারণে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রয়োজন।
১১ জুলাই বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। পরে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় বাংলাদেশ রেলওয়ে গাছ কাটার সিদ্ধান্ত বাতিল করে।
সৈয়দপুর রেলওয়ের জ্যেষ্ঠ সহকারী প্রকৌশলী তহিদুল ইসলাম জানান, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশ পাওয়ার পর গাছ কাটার সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করা হয়েছে।
তবে তিনি বলেন, কয়েকটি গাছ ইতোমধ্যে মারা গেছে এবং কিছু গাছ যেকোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে। এ দাবির পক্ষে তিনি একটি হেলে পড়া গাছ, একটি পড়ে যাওয়া গাছ এবং তিনটি মৃত গাছের ছবি দেখিয়েছেন।
এর আগে রেলওয়ে জানিয়েছিল, জনস্বার্থে ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচিত ৩৩টি গাছ অপসারণের পাশাপাশি চলতি বর্ষায় পাঁচ হাজার নতুন গাছের চারা রোপণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
রেলওয়ে সূত্র জানায়, ১৮৭০ সালে তৎকালীন আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ের বড় কারখানা প্রতিষ্ঠার পর সৈয়দপুর শহর পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা হয়। সেই সময় সড়ক, ড্রেনেজ, কুপিবাতির স্ট্রিটলাইটের পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক গাছ লাগানো হয়েছিল। ওই সময়ের অনেক গাছ এখনো শহরের ঐতিহাসিক স্মারক হিসেবে টিকে আছে।
বেসরকারি সংস্থা রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের (আরডিআরসি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের মার্চ থেকে ২০২৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পে দেশে প্রায় ১৩ লাখ গাছ কাটা হয়েছে। সংস্থাটির ‘লগিং অব প্ল্যান্টস ইন বাংলাদেশ (২০২৪–২৫)’ শীর্ষক গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত প্রায় ১ লাখ ৮২ হাজার গাছ কাটা হয়েছে। এর আগের বছরে একই ধরনের প্রকল্পে গাছ কাটার সংখ্যা ছিল প্রায় সাড়ে ১১ লাখ।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ছালেহ আহমদ খান বলেন, শতবর্ষী গাছ সংরক্ষণের জন্য প্রধান ডালগুলো সংযুক্ত করে স্থিতিশীল রাখা, কাণ্ডে প্যাঁচযুক্ত ইস্পাতের রড ব্যবহার, ভারসাম্য রক্ষায় প্রয়োজনীয় ছাঁটাই এবং ঝুঁকে পড়া ডালের নিচে শক্তিশালী কাঠ বা ধাতব খুঁটি স্থাপনের মতো ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।
তিনি আরও বলেন, শতবর্ষী গাছ দীর্ঘদিন টিকিয়ে রাখতে আশপাশের সহায়ক উদ্ভিদ সংরক্ষণও জরুরি, কারণ সেগুলো মাটির পুষ্টি বৃদ্ধি করে গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও দীর্ঘায়ুতে সহায়তা করে। ভারতের বিভিন্ন গবেষণার তথ্য উল্লেখ করে তিনি জানান, অনুকূল পরিবেশে রেইনট্রি প্রায় ১০০ বছর এবং বটগাছ ২৫০ থেকে ৪০০ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকতে সক্ষম।
